Select your Top Menu from wp menus
শুক্রবার, ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ ইং ।। সকাল ১০:১৯

সাজা শেষেও মুক্তি মিলছে না ৯৮ বিদেশির

65707_jkaraঅবৈধ অনুপ্রবেশসহ নানা অপরাধে ঠাঁই হয়েছিল কারাগারে। বিচারে শাস্তিও হয়। সাজার মেয়াদও শেষ হয়েছে। কিন্তু নিজ দেশে ফিরতে পারছেন না এমন ৯৮ বিদেশি। তারা দেশের বিভিন্ন কারাগারে অন্তরীণ আছেন। সাজার মেয়াদ শেষ   হওয়ার পরও বন্দির স্বদেশ প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত জটিলতার ফাঁদে আটকা পড়েছেন তারা। নানা প্রাতিষ্ঠানিক ও রাষ্ট্রীয় জটিলতায় কয়েক মাস বা বছর থেকে এক-দেড় যুগ ধরে বাংলাদেশের কারাগারে বন্দি তারা।
তেমনই একজন সুমন দাস। তিনি ভারতীয় নাগরিক। পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার খোর্দা এলাকার মহিন্দনগর গ্রামের বাসিন্দা। পিতার নাম সুরেন দাস। অবৈধ অনুপ্রবেশের পর ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে রাজধানীর মতিঝিল থানা পুলিশের হাতে পাকড়াও হয়েছিলেন। তারপর মামলার (নং-৮২(৯)০৭) আসামি হয়ে শ্রীঘরে। তার বিচার শেষ হতে লাগে ৭ বছরের বেশি সময়। ২০১৪ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি আদালত তাকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। আর সেই সাজা কার্যকর দেখানো হয় সেই ৭ বছর আগে ২০০৭ সালের ২৯শে সেপ্টেম্বর থেকে। সে হিসাবে ২০০৮ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর তার সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। জরিমানা অনাদায়ে সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল আরো একমাস পর ওই বছরের অক্টোবরে। কিন্তু এখনো তার মুক্তি মিলেনি। এখন মুক্তির অনিশ্চিত প্রহর গুনছে কাশিমপুর কারাগার-২ এ। কারা অধিদপ্তরের দাবি ২০১৪ সালে রায়ের পর তাকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো সাড়া আসেনি।
মিয়ানমারের নাগরিক হাফেজ আহমদ আকিয়াব রাজ্যের মংডু এলাকার মিয়াদি গ্রামের আবুল হোছাইনের পুত্র। ২০০০ সালের ৪ঠা অক্টোবর টেকনাফ থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর পাঠানো হয় কক্সবাজার জেলা কারাগারে। কক্সবাজার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার ৬ মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেন। তার সাজা কার্যকর শুরু হয় ২০০০ সালের ৬ই অক্টোবর। শেষ হয় পরের বছর ১৯শে এপ্রিল। একই বছরের ১৮ই জুলাই তার সম্ভাব্য একটি মুক্তির দিন থাকলেও আজ পর্যন্ত মুক্তি পাননি তিনি। সাজা শেষের প্রায় ১৬ বছর ধরে জেল খাটছেন হাফেজ আহমদ।
২০০৫ সালের ১০ই নভেম্বর চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানা পুলিশ ওই এলাকা থেকে পাকিস্তানের করাচি সদরের সালামতের ছেলে মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করে। পরের দিন তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এ মামলায় চুয়াডাঙ্গা দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাকে ৩ মাস কারাদণ্ড দেন। পরের দিন থেকে সেই কারাদণ্ড কার্যকর শুরু হয়ে ২০০৬ সালের ৩১শে জানুয়ারি সাজার মেয়াদ শেষ হয়। পরের দিন ১লা ফেব্রুয়ারি তার মুক্তির কথা থাকলেও গত ১১ বছর তিন মাসেও মুক্তি পাননি তিনি। একইভাবে রংপুর সেন্ট্রাল জেলে মুক্তির প্রহর গুনছেন নেপালের নাগরিক পবন কুমার ইয়াদব। তিনি নেপালের সবতারি জেলার  রাজীব রাজ এলাকার পারবিহি গ্রামের দেব নারায়ণ ইয়াদবের ছেলে। মুক্তির আদেশ পাওয়ার ৩ বছর ৩ মাস পরও তিনি কারাকক্ষে।
কারা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বাংলাদেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে (এপ্রিল’১৭ পর্যন্ত) ১৬টি দেশের ৫৬৫ জন নাগরিক বন্দি রয়েছেন। এর মধ্যে ১৪৬ জন ভারতের, মিয়ানমারের ৩৪৬ জন, পাকিস্তানের ৩৯ জন, নাইজেরিয়ার ৫ জন, তাঞ্জানিয়া, পেরু ও ইরানের ৩ জন করে ৯ জন, নেপালের ২, মালয়েশিয়ার ৬, থাইল্যান্ডের ৭ জন এবং আলজেরিয়া, চীন, জার্মানি ও ঘানার ১ জন করে নাগরিক। ওই ৫৬৫ বিদেশি বন্দির মধ্যে ৪১৫ জনের বিচারকাজ চলছে এবং ৫২ জনের বিচার শেষে সাজা ভোগ করছেন। বাকি ৯৮ জন বন্দির সাজার মেয়াদ শেষ হলেও স্বদেশের প্রত্যাবর্তন সংক্রান্ত নানা জটিলতায় তারা মুক্তি পাচ্ছেন না। এর মধ্যে ৭৩ জন ভারত, ১৮ জন মিয়ানমার, ২ জন পাকিস্তান, ২ জন নেপাল ও অপর ৩ জন ইরানের নাগরিক।
কারা সূত্রগুলো জানায়, কোনো বিদেশি নাগরিকের সাজার মেয়াদ শেষ হলে কারাকর্তৃপক্ষ তার সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি কারা অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানায়। কারা অধিদপ্তর ব্যবস্থা নিতে বন্দির বৃত্তান্তসহ চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা পাঠায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। ওই মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসে জানায়। ওই দূতাবাস তা আবার নিজ দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানায়। তারা ওই দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে তা পাঠায় পুলিশের কাছে। নাম-ঠিকানাসহ যাবতীয় তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের পর একইভাবে তা আবার বাংলাদেশের কারা অধিদপ্তর হয়ে সংশ্লিষ্ট কারাগারে যায়। কারাগার থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে ওই বন্দিকে নিজ দেশে পাঠানো হয়। আর সীমান্তবর্তী প্রতিবেশী দেশ হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে কারারক্ষী ও পুলিশ ওই বন্দিকে নিয়ে বিজিবির কাছে নেয়া হয়। ওই বন্দির বাড়ি থেকে কাছে এমন স্থানে বিজিবি ও সংশ্লিষ্ট দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সঙ্গে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে সে দেশে তাকে হস্তান্তর করে।
কিন্তু সে প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট দু’দেশের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবহেলা, নিজ দেশে ওই বন্দির পরিচয় খুঁজে না পাওয়া, স্বজন বা তাদের সাড়া না পাওয়াসহ নানা কারণে তাদের স্বদেশে পাঠানোর উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে না।
বন্দির স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সহায়তা দিয়ে থাকে এমন একটি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার এক কর্মকর্তা বলেন, কারা ব্যবস্থাপনার এই দিকটার উপর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আরো বেশি গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। এখানে আইনের লঙ্ঘনটা বন্দিদের জীবনে খুবই অমানবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। এর দায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্র ও কারাসহ সংস্থাগুলো এড়াতে পারে না। কিন্তু প্রক্রিয়াগত জটিলতার অজুহাতে স্পর্শকাতর বিষয়টিকে দিব্যি এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (প্রশাসন) মো. আবদুল্লাহ-আল-মামুন বলেন, কারা অধিদপ্তর সাজার মেয়াদ শেষ হওয়া প্রায় প্রত্যেক বন্দিকে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জন্য ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়ার নানা স্তরের জটিলতায় অনেকে দীর্ঘ দিন ধরে আটকে পড়েছেন।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *