Select your Top Menu from wp menus
বৃহস্পতিবার, ১৯শে অক্টোবর ২০১৭ ইং ।। সন্ধ্যা ৬:৪৬

মরুভূমিতে কেন এত শহর বানাচ্ছে সৌদি আরব?

প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সৌদি আরবের অর্থনীতি তেলে ভাসছে! এখন পর্যন্ত দেশটির চালিকাশক্তির মূলে আছে তেল রপ্তানি করে পাওয়া অর্থ। রাজতন্ত্রের খরচও মিটছে তা দিয়েই। তবে এখন এই কৌশল পরিবর্তন করতে চাইছে সৌদি আরব। কারণ প্রাকৃতিক সম্পদ একদিন না একদিন ফুরিয়ে আসবে। তাই বিকল্প খুঁজতে বেছে নেওয়া হয়েছে বিরান মরুভূমিকে।

সৌদি আরব হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার মরুভূমিকে নতুন শহরে পরিণত করতে চাইছে। শুধু গত মাসেই নেওয়া হয়েছে এমন দুটি বড় প্রকল্প। এগুলোর একটির আয়তন বেলজিয়ামের চেয়ে বড়! আর অন্যটি প্রায় মস্কোর সমান। মূলত তেলভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে রূপান্তর, নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি ও বিনিয়োগ বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শহর গড়ে তুলতে চাইছে সৌদি আরব। এগুলোতে একটি জটিল কার্যক্রমের জন্য সমন্বিত সেবাব্যবস্থা, পর্যটন, শিল্প ও আর্থিক সংস্থানবিষয়ক বিশেষ স্থান, বিনোদন শহর এবং ১০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

আবুধাবির বাণিজ্যিক ব্যাংক পিজেএসসির প্রধান অর্থনীতিবিদ মনিকা মালিক বলেন, অর্থনৈতিক শহরের ব্যাপারে সার্বিক উন্নয়নের হার খুবই ধীরগতির। শুধু এখন নয়, তেলের দাম কমে যাওয়ার আগেও এমনই ছিল। তখন থেকেই হাতে নেওয়া প্রকল্পের সংখ্যার তুলনায় কাজের গতি খুবই কম।

গত এপ্রিল মাসে সৌদি সরকার ঘোষণা করে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’। ৮৪ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনায় সরকার বলেছে, তারা অর্থনৈতিক শহরের প্রকল্পগুলো নিয়ে এমনভাবে কাজ করতে ইচ্ছুক, যেন গত দশকের ভুলগুলোকে শুধরে নেওয়া যায়। সরকার এই শহরগুলোর ‘সম্ভাবনা’ উপলব্ধি করতে পারেনি বলে এতে মন্তব্য করা হয়েছে।

সৌদি আরবের ৫০টি দ্বীপকে বিশেষভাবে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেখানকার আল-মদিনা প্রদেশের মাদাইন সালেহ নামের প্রত্নতাত্ত্বিক অঞ্চলটিও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হবে। আর মদিনা শহরে গড়ে তোলা স্মার্ট শহরে কাজ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ (আইপি) নিয়ে।

সৌদি আরবের সবচেয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিছু প্রকল্পের মধ্যে লোহিত সাগরও আছে। এর উপকূলীয় এলাকাকে পর্যটনের জন্য বেছে নেওয়া হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সারা বিশ্বের পর্যটকেরাই এদিকে আকৃষ্ট হবেন। উমলু ও আল ওয়াহ শহরে উন্নয়নকাজ করা হবে ধনী পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে। ২০১৯ সালে এই প্রকল্পটি শুরু হওয়ার কথা। প্রথম পর্বের কাজ শেষ হবে ২০২২ সালে। অবশ্য এ প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয় নিয়ে কিছু জানানো হয়নি।

লন্ডনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টেনেও ইন্টেলিজেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিসপিন হজ বলেন, ‘সৌদি সরকারের সাংস্কৃতিক ও আইনি বাধাগুলো পার হতে হবে। মদ আর পোশাকের ওপর বিধিনিষেধ যদি পরিবর্তন করা না যায়, তবে বাজারে তা কার্যকর হবে না।’

অন্যদিকে মক্কার পশ্চিমে আল ফাইসালিয়াহ প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। এটি আকারে প্রায় মস্কোর সমান। এখানে থাকবে আবাসিক ভবন, বিনোদন কেন্দ্র, বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর। ২০৫০ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে এর।

রিয়াদের দক্ষিণ-পশ্চিমের আল কিদিয়া শহরকে সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও বিনোদনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এখানে সাফারি ও থিম পার্কও থাকবে।

এসব বড় প্রকল্পের বেশির ভাগেরই প্রধান বিনিয়োগকারী হলো সৌদি আরবের সার্বভৌম তহবিল। তবে অন্য প্রতিষ্ঠানও সঙ্গে আছে। কিছু ক্ষেত্রে আবার দুবাইয়ের প্রতিষ্ঠানও যোগ দিয়েছে।

অর্থনীতির রূপান্তরের স্বার্থেই রক্ষণশীল সমাজে বিনোদনের ওপর কড়াকড়ি কমাতে চাইছে সৌদি আরব। গত বছর কনসার্ট, নাচের অনুষ্ঠান ও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী করা হয়েছে। এসবে অংশও নিয়েছে হাজার হাজার মানুষ। ২০৩০ সালের মধ্যে চিত্তবিনোদন খাতে গৃহস্থালি ব্যয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সৌদি সরকার।

লন্ডনভিত্তিক জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ভূরাজনৈতিক কৌশলবিদ ফিলিপে ডোবা-প্যান্টানাকি বলেন, বর্তমান কর্তৃপক্ষ বিনোদনের ওপর থেকে নিষিদ্ধ তকমা তুলে দিয়ে দেশটিকে বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত করতে চাইছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিনোদন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এখনো সৌদি সমাজের একটি বড় অংশ এর প্রতি অনুকূল ভাবাপন্ন নয়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় এর ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক কাঠামোবদলের এই যুদ্ধে কোমর বেঁধেই নেমেছে সৌদি সরকার। রাজতন্ত্রেরও বেজায় সায় আছে। কিন্তু একটি চরম রক্ষণশীল সমাজে এই প্রক্রিয়া কতটুকু সফল হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

ব্লুমবার্গ অবলম্বনে অর্ণব সান্যাল

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *