Select your Top Menu from wp menus
সোমবার, ২৩শে অক্টোবর ২০১৭ ইং ।। সকাল ১০:১৪

এক মাসের মধ্যে নতুন নীতিমালা মেডিকেল টেস্ট নিয়ে অরাজকতা

জেসমিন বেগম। খাদ্যনালী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে দেশের একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। চিকিৎসক এক্সরে বেরিয়াম মেল ফলো থ্রো এবং তলপটের প্লেন এক্সরে করার পরামর্শ দেন। এই পরীক্ষা দু’টি তিনি আগস্টের গোড়ার দিকে রাজধানীর গ্রিন লাইফ হাসপাতালে করান। এতে খরচ পড়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা। তিনি অভিযোগ করেন, এই পরীক্ষাগুলো সরকারি হাসপাতালে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকায় করানো হয়। এই রোগী আরেকটি টেস্ট করান ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। পরীক্ষাটির নাম বেরিয়াম সোয়ালো ইসাফেগাস। এ জন্য গুনতে হয়েছে ২ হাজার ৫০ টাকা। এই পরীক্ষার চার্জ সরকারি হাসপাতালে ৫০০ টাকা। আরেক রোগী নাসরিন সুলতানা। গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। চিকিৎসক তাকে পরামর্শ দিয়েছেন সিটি স্ক্যান করতে হবে। সে মতে, সিটি স্ক্যান করার সিদ্ধান্ত নেন নাসরিন। গত বছরের ২৩শে মার্চ ডেমরা থেকে মেডিনোভা মেডিকেল সার্ভিসের ধানমন্ডির শাখায় আসেন তিনি। নাসরিন অভিযোগ করেন এই একটি পরীক্ষার জন্যই তার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা নিয়েছে মেডিনোভা। তার স্বামী ইউসুফ আলী বলেন, মাস শেষে যে টাকা ঘরে আসে তার বেশির ভাগই চলে যায় চিকিৎসা ব্যয়ে। ডাক্তারের কাছে গেলেই পরীক্ষা করতে দেয়। অন্য হাসপাতাল থেকে করানো রিপোর্ট দেখালেও সেই একই পরীক্ষা আবার করতে দেয়। বেশির ভাগ ডাক্তারই নির্দিষ্ট করে দেন কোন প্যাথলজিতে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাবেন।
শুধু জেসমিন বা  নাসরিন নন, রাজধানীসহ সারা দেশে মেডিকেল টেস্ট বা প্যাথলজি পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভেদে গলাকাটা মূল্য নেয়ার অভিযোগ পাওয়া যায় অহরহ। এই নিয়ে দেশে নিয়মিত অরাজকতা চলছে। সরকারি হাসপাতালগুলোর কোথাও কোথাও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য তালিকা টাঙানো থাকলেও বেসরকারি হাসপাতালে তা চোখে পড়ে না। ফলে এতে ফাঁদে পড়েন রোগী ও তার অভিভাবকরা। আর চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষকে রীতিমতো চরম হিমশিম খেতে হয়। কেউ কেউ বিপদ আপদে চিকিৎসা খাতের জন্য সামান্য বাজেট বরাদ্দ রাখলেও অধিকাংশ সময়ই ব্যয় হয় বাজেটের দ্বিগুণ কিংবা তারও বেশি। চিকিৎসা বিজ্ঞান যত আধুনিক হচ্ছে ততই নানাবিধ পরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। আগের মতো রোগীর নাড়ি টিপে কিংবা লক্ষণ বিচার করে রোগ নির্ণয়ের চেষ্টা করা হয় না। বিশেষ করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের অধিকাংশই এখন একাধিক পরীক্ষা ছাড়া ওষুধ দিতে চান না। শতভাগ সঠিক রোগ নির্ণয় করতে হলে প্যাথলজি ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার ফলাফল জানা আবশ্যক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মূলত চিকিৎসকদের ‘কমিশন ব্যবসা’র কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যয় সরকারি- বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। যেসব চিকিৎসক বেসরকারি ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী পাঠান, তাদের একেকটি পরীক্ষার মোট চার্জের ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ কমিশন দেয়া হয়। কোনো কোনো চিকিৎসক এর চেয়েও বেশি কমিশন পান। তাদের এই কমিশন প্রদান করে অতিরিক্ত মুনাফা নিশ্চিত করতেই বিভিন্ন পরীক্ষার চার্জ প্রকৃত খরচের চেয়ে অনেক গুণ বেশি নেয়া হয়।
বিভিন্ন স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যয় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে চারগুণ, পাঁচগুণ পর্যন্ত বেশি নিচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো। সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দুর্বল মনিটরিং, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মালিকদের অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা এবং একশ্রেণির চিকিৎসকের ‘কমিশন বাণিজ্যের’ কারণেই এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ সহজ-সরল নিরীহ মানুষগুলো এর শিকার হচ্ছেন। এতে করে অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে রোগীর চিকিৎসা ব্যয়। নিয়ন্ত্রণহীন আকাশচুম্বী প্যাথলজি ফি’র কারণে মধ্যবিত্ত রোগীরা অনেক সময় বিনা চিকিৎসায় জটিল সব রোগে ভোগেন। সঠিক নীতিমালা প্রয়োগ করে এই প্যাথলজি ফি’র উচ্চমূল্য বন্ধ করে এটাকে একটি নির্দিষ্ট হারের আওতায় নিয়ে এলে সেবা নিতে হিমশিম খেতে হবে না রোগীদের। এমনই মন্তব্য  রোগী ও তার স্বজনদের। তারা বলেন, সরকার সমপ্রতি হার্টের রিংয়ের দাম যেভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, একইভাবে বেসরকারি হাসপাতালের বিনিয়োগ চিন্তা করে একটি লাভ ধরিয়ে তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষারও চার্জ নির্ধারণ করে দিতে পারে। এতে জনগণ উপকৃত হবে বলে রোগী ও তার স্বজনরা মন্তব্য করেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার নির্ধারিত স্বাস্থ্যসেবার মূল্য সর্বশেষ গেজেট আকারে প্রকাশ হয় ২০১০ সালে। একই বছরের ২রা মার্চ এটি সংশোধন করে একটি পরিপত্র জারি করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। রোগীর সুবিধার্থে সব হাসপাতালে এটি প্রদর্শনের নিয়ম রয়েছে।  কিন্তু সরকারি এই পরিপত্র সরকারি হাসপাতাল মানলেও বেসরকারি হাসপাতালে তার সমন্বয় নেই। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে তা চোখে পড়ে না। সবকিছু জানার পরও এ বিষয়ে রহস্যজনকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত আছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী, আলট্রাসনোগ্রাফি পরীক্ষার জন্য চার্জ নির্ধারণ করা হয়েছে সিঙ্গেল ১১০ টাকা এবং ডাবল ২২০ টাকা। অথচ রাজধানীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে এ পরীক্ষার জন্য চার্জ দিতে হয় ১৫শ’ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা।  ব্রেনের সিটি স্ক্যানের জন্য (ওষুধ ছাড়া) সরকার নির্ধারিত চার্জ ২ হাজার টাকা। কিন্তু বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নেয়া হয় কমপক্ষে ৪ হাজার টাকা।
সরকারি তালিকা অনুযায়ী এমআরআই ইনডিভিজ্যুয়াল (পেইন) ৩ হাজার টাকা এবং কনট্রাস্ট ৪ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে একজন রোগীর কাছ থেকে নেয়া হয় ৭ হাজার টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা। সরকার নির্ধারিত চেস্ট এক্স- রে চার্জ ২শ’ টাকা, এক্স-রে স্ক্যান ১৫০ টাকা।  কিন্তু বেসরকারিতে এ চার্জ ৪৫০ টাকা থেকে ৫শ’ টাকা। একই ধরনের ব্যবধান দেখা গেছে, ক্লিনিক্যাল প্যাথলজির ক্ষেত্রে। টিসি, ডিসি, ইএসআর ও হিমোগ্লোবিন একত্রে সরকার নির্ধারিত চার্জ ১৫০ টাকা। এক্ষেত্রে রাজধানীর নামিদামি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলো ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা করে নেয়। সরকারিভাবে এইচবিএসএজি চার্জ ১৫০ টাকা। এ পরীক্ষা করাতে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক ভেদে নেয়া হয় ৬শ’ থেকে ৮শ’ টাকা করে। ব্লাড, ইউরিন ও স্টুল কালচারের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি ২০০ টাকা। এক্ষেত্রে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নেয় ৬০০ থেকে ১৫০০ টাকা। এভাবে ২৩টি ক্যাটাগরিতে মোট ৪৭০টি আইটেমের ফি বা চার্জ নির্ধারণ আছে ওই পরিপত্রে।
বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্যের বিষয়ে জানতে চাইলে মেডিনোভার ম্যানেজার (প্রশাসন) নাসিম ওয়াকার  বলেন, সরকার এখন পর্যন্ত বেসরকারি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলোর জন্য ফি নির্ধারণ করে দেয়নি। সবার জন্য একই নীতি থাকলে ভালো। এটা সবাই অনুসরণ করবে। সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিকের খরচ অনেক বেশি।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. কাজী জাহাঙ্গীর  বলেন, এই পরিপত্র সরকারি হাসপাতালের জন্য করা হলেও বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক-এর প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার চার্জ নির্ধারণের জন্য প্রক্রিয়া চলছে। গত সপ্তাহে এবিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে (বিএমএ) সর্বশেষ বৈঠক হয়েছে। এ বিষয়ে একটি খসড়া হয়েছে। আশা করি আগামী এক মাসের মধ্যে অনুমোদন হবে। এছাড়া তিনি আরো জানান, আগামী মাসে এ সংক্রান্ত অনলাইন চালু হবে। তখন মানুষ সুফল ভোগ করবেন। বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক কেন্দ্রগুলো ইচ্ছামতো ফি নেয়ার ব্যাপারে তিনি বলেন, মনিটর হচ্ছে। মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে কিছু প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করা হয়েছে।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *