শিরোনাম

শীত উৎসব

| ০৪ ডিসেম্বর ২০১৭ | ১:৪২ অপরাহ্ণ

শীত উৎসব

হামিম রাফি , নিউজ ডেস্কঃ বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পলিবিধৌত বাংলাদেশ ছয় ঋতুর দেশ। প্রতিটি ঋতু ভিন্ন মেজাজে, ভিন্ন আমেজ নিয়ে আসে এই দেশে।

ঋতুর সংখ্যাগত পরিক্রমায় শীতের স্থান পঞ্চমে। শীতের সঙ্গে উত্সবের একটা গভীর যোগসূত্র রয়েছে। গ্রাম বাংলায়, এমনকি নগরেও উত্সবের আমেজ নিয়ে আসে শীত। এই উত্সব একেবারেই লৌকিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। এই উত্সবের সঙ্গে এ দেশের মানুষের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। শীতকালটা বিশেষ বিশেষ অনুষঙ্গ নিয়ে হাজির হয় বছর বছর, তাই এই কালটা আমাদের জন্য বিশেষ হয়ে ওঠে।
আমাদের দৈনন্দিন জীবনে একটা বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে শীতকাল। গরম আমাদের বিচ্ছিন্ন করে, আর শীত করে যূথবদ্ধ। মানুষের যূথবদ্ধতা মানেই উত্সব।

কোনো উত্সব ছাড়া মানুষ সাধারণত এক জায়গায় মিলিত হয় না তেমন। মানুষের এই যূথবদ্ধতার চিত্র শীতকালে সর্বত্রই চোখে পড়ে। গ্রামাঞ্চলের কুয়াশায় ঢাকা ভোরে ঘুমভাঙা মানুষরা বাড়ির উঠানে, ঘাটায়, রাস্তার ধারে, চা দোকানের মাচায়, পুকুর বা নদীর পারে যূথবদ্ধ হয়ে রোদ পোহাতে বসে। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, তরুণ-যুবা, বুড়ো-বুড়ি সবাই। মিষ্টি রোদের ওম নিতে নিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেতে থাকে নানা গল্পগুজবে। সবার মনেই এক ধরনের ফুর্তি ফুর্তি ভাব। শীতের দিনটা এভাবেই শুরু হয় ছোটখাটো উত্সব-আনন্দের মধ্য দিয়ে।
বেলা গড়ায় মাঝ আকাশে। দুপুরে এসে উত্সবের মাত্রা ভিন্নতা পায়। যতই কাজ থাকুক, বাড়ির বউ-ঝি, এমনকি পুরুষরাও গোসল করতে পুকুরে নামার আগে কিছুক্ষণ পুকুরপাড়ে বসে আড্ডা দেবেই। আবার গোসল শেষেও সেই একই আড্ডা। আড্ডার যেন আর শেষ হতে চায় না।

সন্ধ্যায় এসে উত্সবটা পায় আরেক মাত্রা। গ্রামাঞ্চলে সাঁঝের বেলায় খড়কুটো, নাড়া, লতাপাতা জ্বালিয়ে বা লাকড়ির স্তূপ বানিয়ে সবাই গোল হয়ে আগুন পোহাতে বসাটা শীত উত্সবের আরেক পর্ব। শীতের মাত্রাটা একটু বেশি হলে শহরেও এমন চিত্র দেখা যায়।

রাতে ঘুমাতে গেলেও আরেকটা মাত্রায় গিয়ে পৌঁছায় শীত উত্সব। গরমকালে পরিবারের সদস্যরা সাধারণত দূরত্ব বজায় রেখে বিচ্ছিন্নভাবে একেক জায়গায় রাত কাটায়। ভ্যাপসা গরমে অবস্থা নাকাল, একসঙ্গে ঘুমানোর তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু শীতের রাত বিচ্ছিন্ন মানুষগুলোকে যূথবদ্ধ করে দেয়। একই লেপ, কম্বল বা কাঁথার নিচে ঘুমানোর মজাটাই আলাদা। একসঙ্গে ঘুমালে শীতটা কম লাগে যেন। এই যূথবদ্ধভাবে ঘুমানোর মধ্য দিয়ে শিশির মাখা দীর্ঘ রাতটাও হয়ে ওঠে উদ্যাপনযোগ্য। শীতকালে দিনের বেলায় কর্মোদ্দীপনায় মুখর থাকে। আবার বৈপরীত্য এর রাতে, নির্জনতা স্তব্ধতার কাছে সে তখন নিজেকে সমর্পণ করে।

এ ছাড়া গ্রামবাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির যত আয়োজন আছে, সবই আয়োজিত হয় শীতের রাতে। যেমন—কবিগান, জারিপালা, মুর্শিদিগান, মাঘীপূর্ণিমা, মানিক পীরের গান, পতুলনাচ, মাদার বাঁশের জারি, মাইজভাণ্ডারি গান ইত্যাদি। কুয়াশার রাতে যতই ঠাণ্ডা হাওয়ায় কাঁপুনি থাকুক, যাত্রাপালা শুনতে যাওয়াকে কি আর ঠেকিয়ে রাখতে পারে! শীতের রাতে নানা ধরনের নাট্যগীতের আয়োজনে মুখর হয় গ্রামবাংলা। শীতকালজুড়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গাজীর গীত, মানিক পীরের গীত, মাদার পীরের গীতসহ বিভিন্ন ধরনের যাত্রাপালা অভিনীত হতে দেখা যায়। কোনো কোনো যাত্রাপালা অভিনীত হয় গ্রামের সাধারণ মানুষেরই উদ্যোগে, তাদেরই অভিনয়ে শখের যাত্রাপালা হিসেবে। গ্রামের সাধারণ কৃষক, কামার, কুমার, মুটে, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও অন্যান্য পেশাজীবী মানুষ নিজেরাই শীতের প্রথম দিকে মহড়া দিয়ে যাত্রায় অভিনয় করে থাকে। অন্যদিকে কিছু পেশাদার যাত্রার দল পেশাদার অভিনেতাদের নিয়ে শীতকালজুড়ে পরিবেশন করে যাত্রাপালা। সুতরাং শীতের সঙ্গে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উত্সবের সংযোগ রয়েছে বৈকি।

শীতকালে পরিবর্তন ঘটে খাবার তালিকায়ও। আবির্ভাব ঘটে কিছু নতুনত্বের, যা শুধু শীতের ঐতিহ্যই বহন করে না, আনন্দও জোগায়। শীতকালে গ্রামের ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠে। এতে উত্সব পায় আরেকটা মাত্রা। নতুন ধানের সঙ্গে পিঠাপুলির সম্পর্ক অনিবার্য। পিঠা ছাড়া শীতের সকালটাই যেন মাটি। ঘরে ঘরে তখন পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। বাড়িতে চুলার পাশে বসে গরম গরম পিঠা খাওয়ার মজাই আলাদা। সকালের কুয়াশা কিংবা সন্ধ্যার হিমেল বাতাসে ভাপা পিঠার গরম আর সুগন্ধি ধোঁয়ায় মন আনচান করে ওঠে। সরষে বা ধনেপাতা বাটা অথবা শুঁটকির ভর্তা মাখিয়ে চিতই পিঠা মুখে দিলে ঝালে কান গরম হয়ে শীত পালায়। সকাল হলে গাঁয়ে পিঠা উত্সব দেখা যায়। এই পিঠাপুলির উত্সবে যোগ দিতে শীতকালে বাড়িতে বেড়াতে আসে মেয়ে, জামাই আর নতুন কুটুম। মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে মা-বাবারা পিঠা বানিয়ে পাঠিয়ে দেন শীতকালে। এখানেও রয়েছে উত্সবের একটা ব্যাপার।

শীতকালে খেজুরের রস খাবারের ক্ষেত্রে বাড়তি উপাদান। খেজুরগাছের মাথায় সুদৃশ্য মাটির হাঁড়ি শীত উত্সবের বার্তা নিয়ে আসে। কাকডাকা ভোরে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে খেজুর রস উনুনে দিয়ে বাড়ির সবাই চারপাশ ঘিরে আগুনের আঁচ নেয়। কেউ কেউ খেজুরের রস বিক্রি করতে নিয়ে যায় হাটে-বাজারে। রাতে চিতই পিঠা তৈরি করে খেজুরের রসে ভিজিয়ে সকালে খাওয়াটা একমাত্র শীতকালেই সম্ভব। আর খেজুরের রস থেকে তৈরি ‘রাব’-এর তো তুলনাই হয় না। এ সময় আখের রস থেকে গুড় তৈরির ধুম পড়ে যায়। গরম গরম গুড় খাওয়ার স্বাদই আলাদা। এটাও শীত উত্সবের আরেকটা অনুষঙ্গ।

আবার শীতের সবজিতেও বৈচিত্র্য দেখা যায়। শীতকালে কত ধরনের সবজিই না পাওয়া যায় বাজারে! নানা ধরনের শাক থেকে শুরু করে মুলা, ভেণ্ডি, লাউ, কুমড়া, করলা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, আলু, বেগুন, টমেটো, শসা, গাজর, শিম, শিমের বিচিসহ তাজা তাজা সব সবজি শীতকালেই বেশি পাওয়া যায়। ফলে শীতকালে ভোজটাও এক ধরনের উত্সবে পরিণত হয়।

আর ভ্রমণের জন্য তো শীতকালের বিকল্প নেই। শীতকালে রাস্তাঘাট শুকনো থাকে, আকাশ থাকে মেঘমুক্ত ঝকঝকে, ঝড়বাদল-বন্যা-ঘূর্ণিঝড়ের ভয় নেই; তাই সবাই ভ্রমণের জন্য এ সময়টাকেই বেছে নেয়। কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, নিঝুমদ্বীপ, সুন্দরবন, পটুয়াখালী, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে শীতকালে যে পরিমাণ পর্যটক যায়, অন্য কোনো ঋতুতে সে পরিমাণ যায় না। যেন ভ্রমণের জন্যই শীতের আগমন! আর ভ্রমণ মানেই তো উত্সব আনন্দ। ভ্রমণপিয়াসীদের জন্য এই ঋতু উত্সবের বার্তা নিয়ে আসে।

শীতে মাঠ থেকে পানি নেমে যাওয়ায় দিগন্তজোড়া মাঠ গাঁয়ের মানুষের কাছে চলাচলের উপযোগী হয়, যা বর্ষায় থাকে অনুপযোগী। দিগন্তজোড়া সরিষার ক্ষেত, হলুদ রঙের বিস্তার। তারই মাঝখানে খটখটে পায়ে চলা কাঁচা সড়ক ধরে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতেও বাধা নেই। মানুষের চলাচলও বেড়ে যায় এ সময়। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া-আসা ও দূর গাঁ থেকে বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসা বধূর প্রতীক্ষার অবসান ঘটায় এই ঋতু। বাপের বাড়ি নাইওরি হয়ে আসে গাঁয়ের বধূরা। গাঁয়ের বাজারগুলোও জমজমাট হয়ে ওঠে। চারদিকে ইচ্ছামতো বেড়ানোর সুযোগে গ্রামবাংলা এ সময় প্রকৃতপক্ষেই উত্সবমুখর হয়ে ওঠে।

পৌষসংক্রান্তি বা মকরসংক্রান্তি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটি বিশেষ উত্সবের দিন। এটিও শীত উত্সবের অন্যতম একটি অনুষঙ্গ; যদিও দেশের সব অঞ্চলে এটি পালিত হয় না। বাংলা পৌষ মাসের শেষের দিন এই উত্সব পালন করা হয়। এই দিন বাঙালিরা বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। তার মধ্যে পিঠা খাওয়া, ঘুড়ি উড়ানো অন্যতম। সারা দিন ঘুড়ি উড়ানোর পরে সন্ধ্যায় পটকা ফুটিয়ে ফানুস উড়িয়ে উত্সবের সমাপ্তি করা হয়।

শীতকালে পোশাক আশাকের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য লক্ষণীয়। ছোট-বড় সবার গায়ে বৈচিত্র্যময় পোশাকের সমাহার। কোট, ব্লেজার, জাম্পার, চাদর, ক্যাপ, মাংকি ক্যাপ—এসব পোশাক একটা উত্সবের আমেজ নিয়ে আসে। ফ্যাশনেবল পোশাক পরিধানের জন্য একমাত্র শীতকালটাই উপযোগী। শীত হলো তাই সমৃদ্ধির প্রতীক। শীতের কুয়াশার আড়ালে প্রকৃতি তৈরি হয় বসন্তের জন্য। গ্রামবাংলার জন্য শীত আনন্দের বার্তা নিয়ে আসে বটে, কিন্তু কারো কারো জন্য আবার দুঃখও নিয়ে আসে। শীতার্ত মানুষ, যাদের শীতের পোশাক কেনার মতো সামর্থ্য নেই, আমাদের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।

সব শেষে শীত প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কয়েকটি চরণ দিয়ে শেষ করছি : ‘শীতের হাওয়া হঠাত্ ছুটে এলো/গানের বেলা শেষ না হতে হতে?/মনের কথা ছড়িয়ে এলোমেলো/ভাসিয়ে দিল শুকনো পাতার স্রোতে। /মনের কথা যত/উজান তরীর মতো;/পালে যখন হাওয়ার বলে/মরণ-পারে নিয়ে চলে…/ঘোরে তারা শুকনো পাতার পাকে/কাঁপন-ভরা হিমের বায়ুভরে। /ঝরা ফুলের পাপড়ি তাদের ঢাকে/লুটায় কেন মরা ঘাসের ’পরে। /হল কি দিন সারা। /বিদায় নেবে তারা?/এবার বুঝি কুয়াশাতে/লুকিয়ে তারা পোউষ-রাতে/ধুলার ডাকে সাড়া দিতে চলে/যেথায় ভূমিতলে/একলা তুমি প্রিয়ে,/বসে আছ আপন-মনে/আঁচল মাথায় দিয়ে?…/শীর্ণ শীতের লতা/আমার মনের কথা/হিমের রাতে লুকিয়ে রাখে/নগ্ন শাখার ফাঁকে ফাঁঁকে…।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

চিরতার ১২ গুণ-ডা. আলমগীর মতি

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ফেইজবুকে আমরা

  • পুরনো সংখ্যা

    SatSunMonTueWedThuFri
    2930     
           
          1
    9101112131415
    30      
         12
           
          1
    2345678
    30      
       1234
    262728293031 
           
         12
           
      12345
    2728293031  
           
    891011121314
    2930     
           
        123
           
        123
    25262728   
           
    28293031   
           
          1
    2345678
    9101112131415
    3031     
          1
    30      
      12345
    272829    
           
        123
           
    28