শিরোনাম

ভালো নেই জর্ডান, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে

| ১০ মে ২০১৮ | ১:২৪ অপরাহ্ণ

ভালো নেই জর্ডান, অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে

মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডানের রাজধানী আম্মান থেকে প্রায় দেড় শ কিলোমিটার দূরে কারাক নগর। এই নগরের পাহাড়ি এলাকায় রয়েছে ঐতিহাসিক প্রাচীন ক্রুসেডার দুর্গ, যা কারাক দুর্গ নামে পরিচিত। এখনো এটি সগৌরবে মাথা উঁচু করে আছে।

এই নগরের চারপাশে রয়েছে চিরসবুজ গাছগাছালি, লতাপাতায় ঘেরা বিশাল দিগন্ত। অনন্য সুন্দর এ অঞ্চল। মায়াবী আকর্ষণে পর্যটকেরা বারবার ছুটে আসেন এখানে। এ কারণেই এ এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল পর্যটন অঞ্চল। এখানে রয়েছে কাজের বিশাল সুযোগ। এ খাত থেকে আয়ও হয় প্রচুর। জর্ডানের আয়ের আরেকটি বড় খাত হলো কৃষি। এ খাত থেকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে থাকে দেশটি। বলা যায়, এ দুটি খাতই জর্ডানের আয়ের বড় উৎস। কিন্তু তা সত্ত্বেও দেশটি এখন অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত। এর কারণ দেশটিতে রয়েছে বেশ কিছু সমস্যা, যা গোটা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রতি জর্ডানের অর্থনীতি ভীষণ চাপে পড়েছে। অর্থনৈতিকভাবে জর্ডানের চাপে পড়ার প্রধান দুটি কারণ রয়েছে। তা হচ্ছে প্রতিবেশী দেশগুলোর অস্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক বাণিজ্য থেকে আয় ক্রমে কমে যাওয়া। প্রধান এ দুটি কারণ ছাড়াও আরও কিছু সমস্যা আছে। সিরিয়া ও ইরাকের অস্থিতিশীলতার কারণে জর্ডানের কৃষিজাত পণ্য আমদানি-রপ্তানিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে।

২০১৬ সালে ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সন্ত্রাসী হামলার কারণে অনেক পর্যটক দেশটি ছেড়ে চলে গেছে। আবার চলতি বছরের প্রথম দিকে পর্যটন নগরী কারাকসহ বিভিন্ন শহরে গোলযোগ ছড়িয়ে পড়ায় দেশটির অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে।

এমনিতেই আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দেশটির অর্থনীতি সংস্কারের পরামর্শ দিয়েছিল। এর ওপর অর্থনৈতিক মন্দা দশার কারণে জর্ডান সরকার গত জানুয়ারি মাসে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। এর ফলে দেশটিতে খাবারের দাম প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে গেছে। এ ছাড়া জ্বালানি তেলের কর ২৪ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।

জর্ডান সরকার বছরে খাদ্য, জ্বালানি ও পানি খাতে ১২০ কোটি ডলার ভর্তুকি দিয়ে থাকে। যা দেশটির বাজেটের শতকরা ৯ ভাগের সমান। এমনিতেই দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় গত বছর দেশটির ঋণ ও জিডিপির অনুপাত ৯৫ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এরও কারণ আছে। দেশটির মাত্র ৩ শতাংশ নাগরিক আয়কর দিয়ে থাকে। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কম। কিন্তু পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সরকারকে বেশ কিছু সরকারের কৃচ্ছ্র নীতি গ্রহণ করতে হয়েছে। এর ফলে সাধারণ নাগরিকের দুঃখ-দুর্দশা আরও বেড়ে গেছে। এ ছাড়া দেশটিতে এখন বেকারত্বের হার প্রায় ১৮ শতাংশ।

বিশ্লেষকদের মতে, দেশটিতে চাহিদার তুলনায় জোগান কমে যাওয়ায় জিনিসপত্রের (বিশেষ করে খাদ্যদ্রব্য) দাম বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। এতে নিজেদের লোকজনের অসন্তুষ্টি বাড়ছে সরকারের ওপর।

সিরিয়ার পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জর্ডানের কৃষি খাত। জিডিপিতে এ খাতের অবদান ৪ শতাংশ। ছোট ছোট শহর ও গ্রামে সিরিয়ার শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মাফরাক, বালকা ও আজলউনের বিভিন্ন গ্রামে তারাই এখন সংখ্যাগরিষ্ঠ। এই অঞ্চলগুলোয় কৃষিই জীবিকার প্রধান উৎস। শরণার্থীদের অবস্থানের কারণে সেই আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

এ ছাড়া আগে খুব কম দামে পোলট্রি পণ্য ও পশুখাদ্য আমদানি করা যেত সিরিয়া থেকে। কিন্তু এখন আমদানি-রপ্তানিতে কড়াকড়ি থাকায় ডিম ও মাংসের প্রবল সংকট চলছে। গত তিন বছরে ডিমের দাম কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। পশুখাদ্যের দাম বেড়েছে ২৫ শতাংশের বেশি। শ্রমবাজারে সিরিয়ার শরণার্থী ও জর্ডানের নাগরিকদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হওয়ায় গ্রামীণ এলাকায় মৌসুমি শ্রমের মূল্য কমে গেছে। শরণার্থীরা মাসে মাত্র ১৫০ জর্ডানি দিনারে (২১০ মার্কিন ডলার) কাজ করতে রাজি হয়ে যাচ্ছেন। এ নিয়ে স্থানীয়দের আক্ষেপের শেষ নেই; অনেক স্থানে গন্ডগোল পর্যন্ত হচ্ছে।

আগে লাতাকিয়া বন্দরের মাধ্যমে জর্ডানের পণ্য যেত ইউরোপের বাজারে। এখন তাদের ব্যবহার করতে হয় ইরাক, তুরস্ক কিংবা ইসরায়েলের বন্দর। এতে পণ্য পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় জর্ডানের পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না বলে জর্ডান উপত্যকার অনেক কৃষক শাকসবজি উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছেন। বলা যায়, জর্ডানের খাদ্য ভারসাম্য ভেঙে পড়েছে। সিরিয়ার শরণার্থীদের কারণে খাদ্য আমদানি অনেক বেড়ে গেছে তাদের।

ভূমধ্যসাগর ও উপসাগরীয় এলাকার সংযোগস্থলে জর্ডানের অবস্থান হওয়ায় দেশটি ভৌগোলিকভাবে বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু ভৌগোলিক এই অবস্থান দেশটির জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বরং অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কারণেই দেশটির অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী ও উপপ্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান বলেছেন, ‘আমরা ভীষণ অর্থনৈতিক চাপে আছি।’

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১০ সালে জর্ডানের রপ্তানি পণ্যের শতকরা প্রায় ২০ ভাগ সিরিয়া ও ইরাকে রপ্তানি করা হতো। ২০১৪ সালে আইএস ইরাকের সোয়াত দখল করে ওই অঞ্চলে ইসলামি স্টেট ঘোষণার পর জর্ডান তার সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এর পরের দুই বছরে নাটকীয়ভাবে ইরাকে রপ্তানি ৬৮ শতাংশ কমে যায়। আর ২০১০ সালে সিরিয়ায় যেখানে রপ্তানি ছিল ২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার, সেখানেও কমে গত বছর হয়েছে মাত্র ৪ কোটি ৩৮ লাখ ডলার।

জর্ডানের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বড় ও সম্ভাবনাময় বাজার হচ্ছে তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরব। প্রতিবেশী এই দেশ প্রায় সবকিছু বাইরে থেকে আমদানি করে থাকে। ২০১৫ সালে জর্ডান প্রথম ১০০ কোটি ডলারের বেশি পণ্যসামগ্রী সৌদি আরবে রপ্তানি করে। এরপর তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় সৌদি আরবে অর্থনৈতিক মন্দা অবস্থার সৃষ্টি হয়। ফলে গত বছর সৌদি আরবে জর্ডানের রপ্তানি কমে যায় শতকরা ২৭ ভাগ (২০১৫ সালের তুলনায়)। আর এর পরিপ্রেক্ষিতেই জর্ডানের একজন মন্ত্রী দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে ‘হতাশাজনক’ বলে আখ্যায়িত করেন।

জর্ডানের ঐতিহ্য অনুযায়ী আগের সরকারগুলো দেশে কোনো অভাব-অভিযোগ দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আরও বেশি ভর্তুকি দিয়েছে। ২০১১ সালে এ অঞ্চলে যখন আরব বসন্ত বয়ে যায়, তখনো বাদশা ভর্তুকি বাড়িয়েছিলেন এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি করেছিলেন।

বৈদেশিক সহায়তা কোনো দেশের জন্য ভালো নয় বিষয়টি বুঝতে পেরেও দেশে স্থিতিশীলতা আনার জন্য জর্ডান সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই পশ্চিমা ও উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশ থেকে শর্তসাপেক্ষে কৌশলগত ঋণ নিয়েছে।

২০১১ সালে আরব বসন্তের সময় ছয় সদস্যের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) দেশটিকে ৫০০ কোটি ডলার ঋণ দেয়। ২০১৬ সালে মাথাপিছু ২৯০ ডলার উন্নয়ন সহায়তা সংগ্রহ করে জর্ডান। এই সহায়তা দারিদ্র্যপীড়িত হাইতি বা যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানের সহায়তার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র আগামী পাঁচ বছরে জর্ডানকে ৬৪০ কোটি ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই সহায়তা তাদের আগের মধ্যেকার চুক্তির তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।

জর্ডান এই যে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক সহায়তা নিচ্ছে, এর বেশির ভাগই শরণার্থীদের পেছনে ব্যয় করা হবে। যুদ্ধের সময় সিরিয়া থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রায় ৬ লাখ ৫৬ হাজার উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে জর্ডান।

উপপ্রধানমন্ত্রী জাফর হাসান বলেন, উদ্বাস্তুদের সামাল দিতে জর্ডান সরকার প্রায় এক হাজার কোটি ডলার ব্যয় করেছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেরাই অর্থনৈতিক সমস্যায় থাকায় তাদের সাহায্যও কমে গেছে। এ ছাড়া ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় সৌদি আরব খুব অল্পসংখ্যক সৈন্য পাঠানোয় বাদশা আবদুল্লাহ ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। অন্যদিকে, জর্ডান ইসরায়েলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলায় উপসাগরীয় দেশগুলোও বিষয়টি খুব একটা ভালো চোখে দেখছে না। সব মিলিয়ে কৌশলগতভাবে জর্ডানের অবস্থা ভালো নেই।

জর্ডানের জন্য আরেকটি বড় দুঃসংবাদ আছে। বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্য ক্রমে বাড়ছে। তা সত্ত্বেও তেলের দাম এখনো কম। এ কারণে জিসিসিভুক্ত বেশির ভাগ দেশ এখন বিদেশি শ্রমিকের বদলে নিজ নিজ দেশের নাগরিকদের দিয়ে কাজ করাতে আগ্রহী। আর এ কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে জর্ডানের প্রায় আট লাখ নাগরিক, যাঁরা উপসাগরীয় দেশগুলোতে কাজ করেন, তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। অথচ গত বছর এই নাগরিকেরাই ২৪০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন।

জর্ডান সরকার আগামী পাঁচ বছরে সে দেশে অবস্থানরত অভিবাসীদের সংখ্যা ২৫ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছে। সিরিয়ার নাগরিক ছাড়াও বর্তমানে দেশটিতে ছয় লাখেরও বেশি মিসরীয় বাস করছে। অন্যান্য দেশের হাজারো লোক রয়েছে, যারা প্রতিবছর এ দেশ থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ডলার তাদের দেশে পাঠিয়ে থাকে।

শেষ পর্যন্ত জর্ডান সরকার সমস্যাগুলোর ভয়াবহতা চিহ্নিত করতে পেরেছে। এ কারণেই সে দেশের সংসদও শিগগিরই দেউলিয়া ও আয়কর আইন পাস করার পরিকল্পনা করছে। আফ্রিকায় নতুন নতুন বাজার খোঁজার চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে লোহিত সাগরের বন্দর আকাবায় কেনিয়ার সঙ্গে মুক্ত বাজার অঞ্চল করার চিন্তাভাবনা করছে দেশটি। নতুন নতুন অবকাঠামো খাতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের লক্ষ্যে পঞ্চবার্ষিকী ‘প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনা’ করছে। এর বেশির ভাগই করা হবে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি)।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিয়ে করলেন নাবিলা

২৭ এপ্রিল ২০১৮

ফেইজবুকে আমরা

  • পুরনো সংখ্যা

    SatSunMonTueWedThuFri
    15161718192021
    22232425262728
    293031    
           
          1
    9101112131415
    30      
         12
           
          1
    2345678
    30      
       1234
    262728293031 
           
         12
           
      12345
    2728293031  
           
    891011121314
    2930     
           
        123
           
        123
    25262728   
           
    28293031   
           
          1
    2345678
    9101112131415
    3031     
          1
    30      
      12345
    272829    
           
        123
           
    28