শিরোনাম

কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রে জাল ভোটের গ্রুপ

| ১৬ মে ২০১৮ | ১২:১৮ অপরাহ্ণ

কেন্দ্র থেকে কেন্দ্রে জাল ভোটের গ্রুপ

এ এক অন্য রকম ভোট। স্থায়ীভাবে ভোটকেন্দ্র দখল না করলেও নগরীজুড়ে ছিল আতঙ্ক। নগরজুড়ে সব কেন্দ্রেই ছিল সরকারদলীয় প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের লোকজনের আধিপত্য। ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি গ্রুপ জাল ভোট দেয়ার মিশনে নামে। ভোটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জাল ভোট দেয়া চালিয়ে যায় নিশ্চিন্তে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সঙ্গে সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষক বের হলেই কেন্দ্র দখলে নিয়ে ১০ মিনিটের মধ্যে সিল মেরে বাক্স ভরে সটকে পড়ে তারা।তারা সকাল ৮টা থাকে ১০টা পর্যন্ত প্রথমে রেকি করে কয়েকটি কেন্দ্রে। বিএনপি সমর্থিত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সমর্থকদের দুর্বল অবস্থান ও সাংবাদিকদের মুভমেন্ট দেখে ১০টার পর শুরু করে জাল ভোট দেয়ার মিশন। ১০টার দিকে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী তালকুদার আবদুল খালেক প্রবেশ করেন ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের নূর নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে। এ সময় সাংবাদিক ও কিছু পর্যবেক্ষকও প্রবেশ করেন তাঁর সঙ্গে। কেন্দ্র পরিদর্শন করে বের হয়ে এলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে সাংবাদিকরাও বের হয়ে আসেন। এমন সময় নগর যুবলীগ নেতা জাকির ও কানা রানার নেতৃত্বে ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি গ্রুপ আচমকা প্রবেশ করে ভোটকেন্দ্রের ভেতর। প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইং অফিসার ও ধানের শীষ প্রতীকের এজেন্টদের বের করে দিয়ে শুরু করেন জালভোট প্রদান। ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে সামনে থাকা সব ব্যালট পেপারের বান্ডিলে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করে মুহূর্তের মধ্যে কেন্দ্র ত্যাগ করে। খবর পেয়ে মিডিয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আসতে আসতে সটকে পড়ে তারা। চলে যায় পরবর্তী কেন্দ্রে। একইভাবে প্রতিটি কেন্দ্রে তালুকদার আবদুল খালেক ভেতরে অবস্থান কালে জালভোট গ্রুপ কেন্দ্রের বাইরে অবস্থান নেয়। খালেক ও সাংবাদিক-পর্যবেক্ষকরা বের হয়ে যাওয়ার ১০ মিনিটের মধ্যেই একযোগে প্রবেশ করে মুহূর্তেই সব ভোট দিয়ে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে সটকে পড়ে তারা।

সকাল থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এই জালভোট গ্রুপ বিনা বাধায় জালভোট প্রদান করছে। মুহূতেই স্থান ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে। খবর পেয়ে পুলিশ ও ম্যাজিস্ট্রেটরা এলে কেন্দ্র শান্ত দেখে চলে যাচ্ছেন। ৪নং ওয়ার্ডের দেয়ানা উত্তর পাড়া ভোট কেন্দ্রে বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ওপর হামলা করে তালুকদার আবদুল খালেকের সমর্থকরা। কেন্দ্রে প্রবেশ করে জাল ভোট দিয়ে সরে পড়ে তারা। দুপুর ২টার দিকে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের শেখপাড়া বিদ্যুৎ স্কুল কেন্দ্রে যান তালুকদার আবদুল খালেক। সেখান থেকে তিনি বের হয়ে এলে তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের বহর কেন্দ্রে প্রবেশ করে জাল ভোট দেয়া শুরু করে। একইভাবে তারা জাল ভোট দেয় ওই ওয়ার্ডের হাতেম আলী স্কুল কেন্দ্র, ইসলামাবাদ ভোটকেন্দ্র, পাইওনিয়ার স্কুল ভোটকেন্দ্র, গন্ডামারি লায়ন্স স্কুল ও নিরালয় স্কুল কেন্দ্র থেকেও। এসব কেন্দ্রের বিএনপির পোলিং এজেন্টকে কেন্দ্রে অবস্থানরত প্রশাসনের সামনেই মারধর করে বের করে দিয়ে জাল ভোট দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে টহল পুলিশ ও সাংবাদিকরা আসার আগেই কেটে পড়ে।

২০নং ওয়ার্ডের এইচ আর এইচ প্রিন্স আগাখান উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ সমর্থকরা নৌকা মার্কায় সিল মারে। ২৫ নম্বর ওয়ার্ডে দারুল উলুম সিদ্দিকীয়া কামিল মাদরাসা কেন্দ্রে হঠাৎ প্রবেশ করে জালভোট দেয়া শুরু করে আবদুল খালেকের লোকজন। লবণচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও তারা পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়ে সিল মারে। ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় কেন্দ্রে জোর করে ব্যালটে সিল মারে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এই কেন্দ্রে ২০ থেকে ২৫ জন যুবক জোর করে প্রবেশ করে কেন্দ্রের ৭ নম্বর বুথে জালভোট দিয়ে বাক্স ভরে সটকে পড়ে। এ বুথের ধানের শীষের পোলিং এজেন্ট কাকলী খান মানবজমিনকে বলেন, জাল ভোট দেয়া যুবকদের সবার জামায় নৌকা প্রতীকের ব্যাজ লাগানো ছিল। তারা এসেই ধানের শীষের এজেন্টদের বের করে দিয়ে ও প্রিজাইডিং অফিসারকে তার রুমে তালাবদ্ধ করে রেখে সিল মারা শুরু করে। প্রিজাইডিং কর্মকর্তা খলিলুর রহমান বলেন, তিনি পুলিশের সহযোগিতা চাইলে তারা কেউ এগিয়ে আসেনি। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার রুমের পাশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তা নয়ন মিয়া বলেন, কেন্দ্র দখল করে সিল মারার মতো কোনো তথ্য আমি পাইনি। প্রিজাইডিং কর্মকর্তার রুমে কখন তালা মেরেছে আমি জানি না। আমি প্রস্রাব করতে গেছিলাম। ফিরে এসে স্যারকে রুমে পেয়েছি। দুপুর   ১২টার দিকে কেন্দ্র পরিদর্শনে এসে রিটার্নিং কর্মকর্তা ইউনুচ আলী বলেন, জালভোট দেয়ার অভিযোগ পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে ভোটগ্রহণ স্থগিত করেছি। সব ব্যালট পেপার ও বাক্স জব্দ করেছি। কোনো এজেন্ট প্রবেশ করতে না দেয়ার অভিযোগ আসেনি। এলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

২৭ নম্বর ওয়ার্ডের ডি আলী ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপির চিহ্নিত ভোটারদের ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেয় সরকার দলের প্রার্থীর লোকজন। সকাল সাড়ে ১১টার পর নগরীর রূপসা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে পুলিশের সহযোগিতায় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পাঁচটি বুথে প্রবেশ করে সিল মারে। এদিকে ৩১ নম্বর আবদুল মালেক ইসলামীয়া কলেজ কেন্দ্রে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক দল যুবক প্রবেশ করে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলর প্রার্থী খুলনা মহানগর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান রাসেলের নির্বাচনী প্রতীকে সিল মারতে থাকে। প্রায় আধা ঘণ্টা তারা ব্যালটে সিল মেরে চলে যায়। এ সময় খুলনা সোনাডাঙ্গা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুম্মান আহমেদকে পুলিশ হাতেনাতে ধরার পরও বের করে দেয়া হয়। অন্য দুইজনকে ঘণ্টা খানেক আটকে রাখে। সাংবাদিকরা চলে গেলে তাদেরও ছেড়ে দেয়া হয়। তবে আটকদের নাম জানতে চাইলে দায়িত্বরত পুলিশের এসআই বোরহান মিয়া বলেন, আমি অসহায়। আপনাদেরই ভাই ব্রাদার। নাম বলে দিলে এখানে অনেক সমস্যা হবে। এ সময় নির্বাচনী দায়িত্বরত একজন ম্যাজিস্ট্রেটকে কেন্দ্রে দেখা গেলেও মানবজমিনের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, আপনারা আপনাদের কাজ করেন। আমি কিছু বলব না। সিল মেরে যাওয়ার পর এই কেন্দ্রে প্রচুর পরিমাণে ভোটাররা ভোট দিতে আসেন। তবে ব্যালট পেপার না থাকায় প্রায় সকলকেই ভোট না দিয়ে ফেরত যেতে হয়। একই রকম পরিস্থিতি নগরীর শেরেবাংলা রোড সোনা স্কুল কেন্দ্রে। সেখানেও দুপুর দেড়টার মধ্যেই শেষ হয়ে যায় সব ব্যালট পেপার। এই কেন্দ্রের বাইরে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্টদের চেয়ার টেবিল ভাঙচুর করা হয়। তবে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা আলীম হোসেন বলেন, কিছু দুর্বৃত্ত ব্যালটে সিল মারলেও তা বাক্সে ভরতে পারেনি। পরে দুপুর দুটার দিকে কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। ওয়ার্ডের লবণচরা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রেও পোলিং এজেন্টদের পাশাপাশি প্রিজাইডিং অফিসারদের বের করে দিয়ে সিল মারে নৌকার সমর্থকরা।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিয়ে করলেন নাবিলা

২৭ এপ্রিল ২০১৮

ফেইজবুকে আমরা

  • পুরনো সংখ্যা

    SatSunMonTueWedThuFri
    21222324252627
    28293031   
           
          1
    9101112131415
    30      
         12
           
          1
    2345678
    30      
       1234
    262728293031 
           
         12
           
      12345
    2728293031  
           
    891011121314
    2930     
           
        123
           
        123
    25262728   
           
    28293031   
           
          1
    2345678
    9101112131415
    3031     
          1
    30      
      12345
    272829    
           
        123
           
    28