শিরোনাম

জামায়াতের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ বিএনপি

| ০৫ জুলাই ২০১৮ | ১০:২৪ পূর্বাহ্ণ

জামায়াতের কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ বিএনপি

ঘরেবাইরে সংকটে থাকা বিএনপির সঙ্গে দলটির প্রধান শরিক জামায়াতের সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না। বরং সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আলাদা প্রার্থী ঘোষণা করার ঘটনায় জামায়াতের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ বিএনপি। যদিও বিএনপি নেতারা বলছেন, শেষ পর্যন্ত তাঁরা বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারবেন। ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে একক প্রার্থীই নির্বাচন করবে সিলেটে। কিন্তু গতকাল বুধবার ২০ দলীয় জোটের বৈঠকের পরও এ বিষয়টি পুরোপুরি নিশ্চিত করা যায়নি।

সূত্র মতে, বৈঠকে উপস্থিত জামায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য আবদুল হালিম স্পষ্ট করে বলেছেন, বৈঠকে সবার সেন্টিমেন্ট বা মতামত তিনি দলীয় ফোরামে জানাবেন। কিন্তু জামায়াত প্রার্থী সিলেটের নির্বাচন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করবেন কি না সেটি তিনি জানাতে পারবেন না। যদিও হালিম বলেন, বৃহত্তর ঐক্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় এমন কিছু জামায়াত করবে না। তিনি বলেন, বিষয়টি দলীয় ফোরামে আলোচনা করে পরে জানানো হবে। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে আলাপ করে জামায়াতের এমন মনোভাবের কথা জানা গেছে। এর আগে গত ২৭ জুন অনুষ্ঠিত ২০ দলীয় জোটের বৈঠকেও বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যায়নি।

বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকের পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অবশ্য তাত্ক্ষণিক সাংবাদিকদের জানান, সিলেটে ২০ দলীয় জোট এককভাবে নির্বাচন করবে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের এখনো সময় আছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। অন্যদিকে জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, সিলেটে জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সিদ্ধান্তের বাইরে সিলেটে জামায়াত এককভাবে মেয়র পদপ্রার্থী ঘোষণা করেছে। কেন্দ্রীয় বিএনপি থেকে কয়েকবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও জামায়াত ওই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেনি। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে গতকাল পর্যন্ত দুই দফা বৈঠক ব্যর্থ হলো।

সূত্র জানায়, গতকাল বৈঠকের শুরুতে বক্তব্যের একপর্যায়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানান, গত মঙ্গলবার বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান সিলেট সিটি নির্বাচনে জোটের একক প্রার্থীর ব্যাপারে জামায়াতের এক নেতাকে ফোন করেন। কিন্তু ওই নেতা কোনো সাড়া দেননি। জামায়াত গতকালের বৈঠকেও তাদের সিদ্ধান্ত পাল্টায়নি।

জানতে চাইলে বিএনপি স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁরা দুজনই বলেন, ‘জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার চেষ্টা চলছে। আশা করছি সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’ সন্ধ্যায় মির্জা ফখরুল বলেন, ২০ দল এককভাবে নির্বাচন করবে। এ নিয়ে জটিলতা হবে না।

তবে জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিলেটে ন্যূনতম একটি দাবি; আমরা মেয়র পদপ্রার্থীর ব্যাপারে ছাড় চেয়েছি। এটি বিএনপির চিন্তা করা উচিত।’ তাঁর দাবি, মেয়র প্রার্থিতা প্রশ্নে জোটের কোনো ক্ষতি হবে না। কারণ জোট গঠিত হয়েছে জাতীয় নির্বাচনের জন্য। প্রশ্ন উত্থাপন করে জামায়াতের এই নেতা আরো বলেন, গত মোট ১২টি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মধ্যে জামায়াতের মতো বড় একটি দল প্রার্থী কেন দিতে পারবে না? এটা তো রাজনীতির হিসাবে মেলে না; যোগ করেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘বিএনপির দুঃসময় যাচ্ছে এটি যেমন ঠিক; তেমনি আমরাও বলতে পারি আমাদের এই দুঃসময়ে বিএনপিও তো ছাড় দিলে পারে।’

জানতে চাইলে জামায়াতের প্রার্থী সিলেট মহনগর আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের কালের কণ্ঠকে বলেন, সিলেটে জামায়াতের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি জানান, ২০ দলীয় জোটের বৈঠকে অংশ নেওয়া দলের নেতা আবদুল হালিম তাঁকে জানিয়েছেন, সিলেটে প্রার্থী প্রত্যাহার হবে না। এখানে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী এককভাবে নির্বাচন করার কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে এটি ওপেন আছে।

এক প্রশ্নের জবাবে এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আরো বলেন, ২০ দল একসঙ্গে বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিলেটেও বিএনপি সমর্থন চেয়েছে। কিন্তু নিষ্পত্তি হয়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৯ সালের ৩০ নভেম্বর চারদলীয় জোট গঠনের পর জামায়াতের সঙ্গে বর্তমানে বিএনপির সবচেয়ে বেশি খারাপ সময় কাটছে। বিএনপি নেতারা এর জন্য মূলত দুটি কারণ খুঁজে বের করেছেন। প্রথমত, উদারপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির ঐক্য প্রক্রিয়ার কার্যক্রম এগিয়ে চলছে; যাতে খুশি নয় জামায়াত এবং দ্বিতীয়ত, ভারতবিরোধিতার বদলে বিএনপির রাজনীতি বর্তমানে অনেকটাই ভারতমুখী। বিএনপির এ অবস্থানও পছন্দ করছে না জামায়াত।

কিন্তু বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এ দুটি উদ্যোগের কোনোটিই বাস্তবায়ন না করে উপায় নেই তাদের। কারণ, জামায়াতকে খুশি রাখতে গেলে উদারপন্থীরা বিএনপির সঙ্গে ঐক্য করবে না এটি নিশ্চিত। আবার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলাও কঠিন হবে। কারণ, জামায়াতকে নীতিগতভাবে ভারতবিরোধী কট্টরপন্থী দল বলে মনে করে ওই দেশটির কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি তারা বিএনপিকে জানিয়েছেও।

তবে বিএনপি নিজেদের উদ্যোগে জামায়াতকে দূরে সরিয়ে দেয়নি প্রথমত. ভোটের রাজনীতির হিসাব-নিকাশের কারণে। দ্বিতীয়ত. বিএনপির সঙ্গে জোট বাধার কারণেই জামায়াতের ওপর নিপীড়ন বেশি হয়েছে এমন একটি আলোচনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে। অন্যদিকে নাইন-ইলেভেন পরবর্তী বিশ্ব বাস্তবতায় জামায়াত সঙ্গে থাকায় বিএনপি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বেশি চাপের মুখে পড়েছে বলে দলটির এখনকার উপলব্ধি। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচন-পূর্ব ও পরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জামায়াত সঙ্গে থাকার কারণে বিএনপিকে জড়িয়ে জঙ্গিবাদের তকমা দেওয়ার সুযোগ সরকারি দল বেশি পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

তা ছাড়া রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির কাছে এখন আর আগের মতো গুরুত্ব নেই জামায়াতের। কারণ ২০১৩ সালের ১ আগস্ট উচ্চ আদালতের এক রায়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। শুধু তাই নয়, সুপ্রিম কোর্ট একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িপাল্লা বরাদ্দ না দিতে বা দিয়ে থাকলে তা বাতিল করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেন। পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীকের তালিকা থেকে দাঁড়িপাল্লা বাদ দিয়ে গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচন কমিশন। এতে জামায়াত নির্বাচনে অযোগ্য হয়ে পড়ে। এখন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে হলে জোটগতভাবে সংশ্লিষ্ট জোটের প্রতীকে, আর পৃথক হলে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচন করতে হবে দলটিকে।

সব মিলিয়ে রাজনীতিতে আগের চেয়ে জামায়াতের গুরুত্ব কমে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে বিএনপি চাইছে, জামায়াত নিজ থেকে জোট ছেড়ে চলে যাক; যাতে জোট ভাঙার দায়িত্ব বিএনপির ওপর না বর্তায়। অন্যদিকে আগের মতো গুরুত্ব না পাওয়ায় রুষ্ট জামায়াতও চাইছে বিএনপি তাদের বিদায় করুক। জামায়াতের ভেতরেও উপলব্ধি, বিএনপির কাছে আগের মতো ‘মর্যাদা’র জায়গাটি এখন আর তাদের নেই। খুব দায় না পড়লে দলটি বিএনপির কর্মসূচিতেও আজকাল আর যাচ্ছে না। ২০১৬ সালের ১০ মে বিএনপির ‘ভিশন ২০৩০’ রূপকল্প অনুষ্ঠানে তারা যায়নি। ফলে এমন পরিস্থিতিতে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জামায়াত একক প্রার্থী দিলে বিএনপির সঙ্গে দূরত্বের বিষয়টি নতুন করে সামনে চলে আসে।

বিএনপির পাশাপাশি অনেকেই মনে করেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ছেড়ে চলে গেলে ভোটের হিসাব-নিকাশের কারণে সরকারের সঙ্গে জামায়াতের সুসম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এমনকি অলিখিত সমঝোতা হওয়াও অস্বাভাবিক নয় বলে কেউ কেউ মনে করেন। আবার অনেক পর্যবেক্ষকের ধারণা, বর্তমান সরকারের সময়ে গত ১০ বছরে জামায়াত যে পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাতে সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি হওয়া অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা সরকারের সঙ্গে ‘ভোট সমঝোতা’ মেনে নেবে; সেটি কেউ বিশ্বাস করেন না।

তার পরও সিলেট সিটি নির্বাচনে জামায়াতের ভূমিকায় বিএনপির মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। দলটির প্রবীণ এক নেতা সংশয় প্রকাশ করে গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জামায়াতের ভূমিকায় আমাদের মধ্যে সংশয় আছে।’ তাঁর মতে, উদারপন্থী দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে জামায়াত খুশি নয়।

কারণ উল্লেখ করে ওই নেতা বলেন, জামায়াত মনে করছে, গণফোরাম ও বিকল্পধারাসহ উদারপন্থী দলগুলো এলে বিএনপি জোটে তারা গুরুত্ব হারাবে। কারণ এখন পর্যন্ত তারা দ্বিতীয় বৃহত্তম দল। তা ছাড়া ভারত নিয়েও তারা নানা কথা ভাবতে পারে; যোগ করেন প্রবীণ এই নেতা।

এ প্রসঙ্গে অবশ্য মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘উদারপন্থীদের নিয়ে আমাদের পৃথক কোনো ভাবনা নেই। ঐক্য হলেও আমাদের অবস্থানে পরিবর্তন হবে বলে মনে করি না। কারণ সব দলের নেতাদের অবস্থানই আমাদের জানা।’ তাঁর মতে, অনেক দলের প্রধানের জাতীয় ইমেজ থাকতে পারে। কিন্তু দলের সাংগঠনিক শক্তি বা ভোটের রাজনীতিতে কার কী অবস্থান তা সবাই জানেন।

২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ৩৯ আসনে প্রার্থী দিয়ে জামায়াত ৪.৭০ শতাংশ ভোট পায়। তার আগের অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৩১ আসনে প্রার্থী গিয়ে ৪.২৩ শতাংশ এবং তার আগে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে জামায়াত ভোট পেয়েছিল ৮.৬১ শতাংশ।

পর্যবেক্ষকদের মতে, গড়ে জামায়াতের ৫ থেকে ৬ শতাংশ ভোট রয়েছে, যা ভোটের রাজনীতিতে অনেক প্রভাব ফেলে। এ কারণে বড় দলগুলোর সেদিকে দৃষ্টি রয়েছে।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ফেইজবুকে আমরা

  • পুরনো সংখ্যা

    SatSunMonTueWedThuFri
    22232425262728
    2930     
           
          1
    9101112131415
    30      
         12
           
          1
    2345678
    30      
       1234
    262728293031 
           
         12
           
      12345
    2728293031  
           
    891011121314
    2930     
           
        123
           
        123
    25262728   
           
    28293031   
           
          1
    2345678
    9101112131415
    3031     
          1
    30      
      12345
    272829    
           
        123
           
    28