শিরোনাম

কুরআনুল কারিমের কসম করার বিধান

| ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৫:০০ অপরাহ্ণ

কুরআনুল কারিমের কসম করার বিধান

কুরআনুল কারিমের কসম করার বিধান
কারো নামে কসম করার অর্থ তাকে সম্মান দেওয়া ও তার সত্ত্বাকে পবিত্র জ্ঞান করা। এ জাতীয় সম্মানের হকদার একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। যে আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত কোনো সত্ত্বার নামে কসম বা শপথ করল সে মূলত আল্লাহর সম্মান ও অধিকারে ঐ সত্তাকে শরীক ও অংশীদার করল। অতএব, এটা শির্ক। আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করা কবিরা গুনাহ, তবে তা শির্ক নয়। শির্ক কবিরা গুনা থেকেও বড়, হোক সেটা ছোট শির্ক। যে পীরের নামে কসম করল, সে পীরকে আল্লাহর সমকক্ষ স্থির করল; যে নবী-অলি-বুজর্গের নামে কসম করল সে তাদেরকে আল্লাহর সমকক্ষ নির্ধারণ করল; অনুরূপ আল্লাহ ও তার গুণাগুণ ব্যতীত কোনো বস্তুর নামে যে কসম করল, সে আল্লাহর অধিকার তথা বিশেষ সম্মানে ঐ বস্তুকে শরীক করল। উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত কারো নামে শপথ করল সে কুফরী করল অথবা শির্ক করল”।[1]

ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন,“গাইরুল্লাহর নামে সত্য কসম অপেক্ষা আল্লাহর নামে মিথ্যা কসম করব, এটা আমার নিকট অধিক প্রিয়”।[2]

ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:“তোমরা তোমাদের পিতাদের নামে কসম কর না। যে আল্লাহর নামে কসম করে তার উচিৎ সত্য বলা, আর যার জন্য আল্লাহর নামে কসম করা হল তার উচিৎ সন্তুষ্টি প্রকাশ করা, আর যে আল্লাহর নামে সন্তুষ্টি প্রকাশ করল না, তার সাথে আল্লাহর সম্পর্ক নেই”।[3]

যদি কেউ কুরআনুল কারিম কিংবা তার কোনো আয়াতের কসম করে, যা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর নাযিল করা হয়েছে, তবে তার এ কসম বৈধ। কারণ, কুরআন আল্লাহর কালাম, যা তাঁর সিফাতের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সকল সিফাত দ্বারা কসম করা যায়, তাই কুরআনুল কারিম দ্বারা কসম করাও বৈধ। কেউ যদি কুরআন দ্বারা উদ্দেশ্য করে কাগজ, কালি ও আরবি বর্ণমালা, তাহলে এটা জায়েয নয়, বরং শিরকের অন্তর্ভুক্ত; কারণ, কাগজ-কালি ও আরবি বর্ণমালা মাখলুক তথা সৃষ্টিজীব। তাই কুরআনুল কারিমের কসম না করাই ভালো, কারণ তাতে যেরূপ আল্লাহর কালাম রয়েছে, অনুরূপ কাগজ-কালি এবং আরবি বর্ণমালাও রয়েছে।

কসম ও মান্নতের ক্ষেত্রে সাধারণত কসম ও মান্নতকারীর নিয়ত গ্রহণযোগ্য হয়, কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল, আর প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য তাই রয়েছে যা সে নিয়ত করেছে”।[4] তবে কসমের সাথে যদি অপরের হক জড়িত হয়, তাহলে অপর ব্যক্তি তথা কসম গ্রহণকারী ও বিচারকের নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে।

আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“তোমার সাথী যার ওপর তোমাকে সত্যারোপ করছে তার ওপর তোমার কসম সংগঠিত হবে”। অপর বর্ণনায় আছে, “কসম গ্রহণকারীর নিয়তের ওপর কসম সংগঠিত হয়”।[5] অতএব, কসমকারী যদি ভিন্ন কিছু নিয়ত করে, তার সে নিয়ত গ্রহণযোগ্য নয়। হ্যাঁ, কসমকারী যদি মযলুম হয়, তাহলে তার নিয়ত গ্রহণযোগ্য হবে। আর যদি কসমের সময় কোনো নিয়ত না থাকে, তাহলে কসমের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বস্তু ও তার কারণ নিয়ত হিসেবে গণ্য হবে।

কুরআনুল কারিমের উপর কিংবা তার ভিতর হাত রেখে কসম করা বিদ‘আতের অন্তর্ভুক্ত; তবে কসমের কঠোরতা বুঝানো ও মিথ্যা কসমকারীকে ভীতি প্রদর্শনস্বরূপ কেউ কেউ তার অনুমতি প্রদান করেছেন।

শাইখ উসাইমীন রহ.-কে কুরআনুল কারিমের কসম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি উত্তরে বলেন: “আল্লাহ তা‘আলার নাম কিংবা তার সিফাত ব্যতীত কোনো বস্তুর কসম করা বৈধ নয়, ব্যক্তি যখন আল্লাহর নামে কসম করে, তখন তার সামনে কুরআনুল কারিম উপস্থিত করা জরুরি নয়। কুরআনুল কারিমের কসম করার রীতি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে কিংবা তার সাহাবীদের যুগে, এমন কি কুরআন লিপিবদ্ধ হওয়ার পরও ছিল না। তাই প্রয়োজনের মুহূর্তে কুরআনুল কারিম উপস্থিত করা ছাড়া আল্লাহর নামে কসম করাই শ্রেয়”।[6]

ইবন কুদামাহ মাকদিসি রহ. কুরআনুল কারিমের উপর হাত রেখে কসম করার রীতিকে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “শাফে‘ঈ বলেন: আমি তাদেরকে দেখেছি মুসহাফের উপর হাত রেখে কসম মজবুত করতেন। সানা[7]-এর কাদি-বিচারক ইবন মাজিনকে দেখেছি কুরআনুল কারিম দ্বারা কসম মজবুত করতেন। শাফে‘ঈ রহ.-এর সাথীগণ বলেন: কুরআনুল কারিম উপস্থিত করে কসম মজবুত করা জরুরি। কারণ, তাতে আল্লাহর কালাম ও তার নামসমূহ রয়েছে। ইবন কুদামাহ রহ. বলেন, কসমের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং তার খোলাফায়ে রাশেদাহ ও তাদের বিচারকগণ যা করেছেন তার ওপর এটা সীমালঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি, যার পশ্চাতে মজবুত ভিত্তি ও কোনো দলীল নেই।

অতএব, ইবন মাজিন কিংবা কারো কর্মের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদের কর্ম কখনো ত্যাগ করা যায় না”।[8] কুরতুবি রহ. বলেন, “ইবনুল আরাবি বলেছেন, কুরআনুল কারিমের উপর হাত রেখে কসম করা বিদ‘আত, কোনো সাহাবী এরূপ করেন নি”।[9]

দ্বিতীয়ত কসম করার জন্য কুরআনুল কারিম কেন, আল্লাহ তা‘আলার নাম কিংবা তার সিফাতের কসম করা হয় না কেন, যা বৈধ এবং যাতে পাপের কোনো আশঙ্কা নেই!? তাই কসমের প্রয়োজন হলে আল্লাহর নামে কসম করুন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:“যার কসম করতে হয়, সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে”।[10]

উল্লেখ্য, তাওরাত, ইঞ্জিল ও জাবুরের উপর হাত রেখে কসম করা কোনো মুসলিমের পক্ষে জায়েয নয়। কারণ, এসব কিতাব সংশ্লিষ্ট নবীদের ওপর আল্লাহ তা‘আলা যেভাবে নাযিল করেছেন, সেরূপ অক্ষত ও অবিকৃত অবস্থায় বিদ্যমান নেই। দ্বিতীয়ত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের শরিয়ত তার পূর্বের সকল শরী‘আত মানসুখ ও রহিত করে দিয়েছে। যদি অনৈসলামিক দেশের ঘটনা হয় এবং বিচারক মুসলিমকে তাওরাত বা ইঞ্জিলের উপর কিংবা উভয় কিতাবের হাত রাখতে বাধ্য করে, তাহলে সে বলবে আমার থেকে কুরআনুল কারিমের কসম গ্রহণ করুন, আমি তার উপর হাত রাখব, যদি বিচারক তার কথা না শুনে তাহলে সে অপারগ, অক্ষম ও মযলুম গণ্য হবে, তখন তার পক্ষে তাওরাত বা ইঞ্জিলের উপর কিংবা উভয় কিতাবের উপর হাত রাখতে সমস্যা নেই, তবে কসমের সময় এসব কিতাবের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার নিয়ত করবে না।

কসম ভাঙ্গার কাফফারা:
কুরআনুল কারিম বা আল্লাহর নাম বা তার কোনো সিফাতের নামে কসম করার পর যদি কসম থেকে ফেরত আসতে চায় অথবা কসম ভঙ্গ করতে চায়, তাহলে কসমের কাফফারা দেওয়া জরুরি। কসমের কাফ্‌ফারা হচ্ছে দশজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া অথবা তাদেরকে পরিধেয় বস্ত্র দান করা অথবা একজন মুমিন গোলামকে মুক্ত করা, যদি এর কোনোটার সামর্থ্য না থাকে, তাহলে তিন দিন সিয়াম রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

“আল্লাহ তোমাদেররকে পাকড়াও করেন না তোমাদের অর্থহীন কসমের ব্যপারে, কিন্তু যে কসম তোমরা দৃঢ়ভাবে কর সে কসমের জন্য তোমাদেরকে পাকড়াও করেন। সুতরাং এর কাফ্‌ফারা হলো দশজন মিসকীনকে খাবার দান করা-মধ্যম ধরণের খাবার, যা তোমরা স্বীয় পরিবারকে খাইয়ে থাক অথবা তাদের বস্ত্র দান, কিংবা একজন দাস-দাসী মুক্ত করা। অতঃপর যে সামর্থ্য রাখে না তবে তিন দিন সাওম পালন করা। এটা তোমাদের কসমের কাফ্‌ফারা-যদি তোমরা কসম কর, আর তোমরা তোমাদের কসম হিফাযত কর। এমনিভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তার আয়াতসমূহ বর্ণনা করেন যাতে তোমরা শোকর আদায় কর”। [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৮৯] খাবার, বস্ত্র দান ও গোলাম মুক্ত করার মাঝে কোনো ক্রম নেই, যে কোনো একটি দ্বারা কাফ্‌ফারা আদায় হবে, তবে এ তিনটি থেকে কোনো একটির ওপর সামর্থ্য থাকা সত্বে সিয়াম পালন করলে কাফ্‌ফারা আদায় হবে না।

সহীহ বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:“আল্লাহর শপথ, আমি কোনো কসম করে যদি তার বিপরীতে কল্যাণ দেখি –ইনশাআল্লাহ, অবশ্যই আমি আমার কসমের কাফ্‌ফারা দিই এবং ভালো কাজটি করি অথবা ভালো কাজটি করি পরে আমার কসমের কাফ্‌ফারা দিই”।[11]

ইমাম মুসলিম ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে কসম করল অতঃপর তার বিপরীতে তদপেক্ষা কল্যাণ দেখল, সে যেন তার কসমের কাফ্‌ফারা দেয় এবং কাজটি করে”।[12]অপর বর্ণনায় আছে, “সে যেন তার কসমের কাফ্‌ফারা দেয় এবং যা কল্যাণ তাই করে”।[13] কসম পুরণ করা না হলে এটাই কসম থেকে বের হওয়ার পদ্ধতি।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ফেইজবুকে আমরা

  • পুরনো সংখ্যা

    SatSunMonTueWedThuFri
         12
    10111213141516
    17181920212223
    24252627282930
           
          1
    9101112131415
    30      
         12
           
          1
    2345678
    30      
       1234
    262728293031 
           
         12
           
      12345
    2728293031  
           
    891011121314
    2930     
           
        123
           
        123
    25262728   
           
    28293031   
           
          1
    2345678
    9101112131415
    3031     
          1
    30      
      12345
    272829    
           
        123
           
    28