Select your Top Menu from wp menus
সোমবার, ২৩শে অক্টোবর ২০১৭ ইং ।। সকাল ১০:২৩

বিশ্বায়নে পিছিয়ে পড়ছে বাংলা

035

ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তরিত না হওয়ায় ভাষার বিশ্বায়নে পিছিয়ে পড়ছে বাংলা। বিশ্বের ১৫২টি ভাষা ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় যুক্ত হলেও বাংলা তাতে নেই। এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ বাংলা ভাষাকে ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিলেও অর্থ সংকটে তা থেমে গেছে। ফলে বাংলা ভাষার তথ্য ও সাহিত্যভাণ্ডার বিশ্বের অন্যান্য ভাষার মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

জানা যায়, ইউনিভার্সাল নেটওয়ার্কিং ল্যাঙ্গুয়েজ (ইউএনএল) প্রোগ্রামের মাধ্যমে একটি ভাষাকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করা যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এটি একটি ইন্টারনেটভিত্তিক প্রোগ্রাম। এই প্রোগ্রামভুক্ত যেকোনো ভাষার টেক্সট-ই কেবল স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্য ভাষায় রূপান্তর করা যায়। ইংরেজি, ফরাসি, চায়না, আরবি, হিন্দিসহ বিশ্বের ১৫২টি ভাষা এরই মধ্যে এই প্রোগ্রামের আওতায় এসে গেছে। এই প্রোগ্রামের আওতায় আসা ভাষাগুলোর যেকোনো তথ্য যে কেউ তার মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। ইন্টারনেটে বিনা মূল্যে এ সেবা পাওয়া যায়। ১৯৯৬ সালে এই প্রোগ্রাম উদ্ভাবন করে টোকিওতে ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্স স্টাডিজ। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এই প্রোগ্রাম প্রসারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইউনাইটেড নেশনস ইউনিভার্সিটি ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠা করে ইউএনডিএল ফাউন্ডেশন। এরাই এখন এ-সংক্রান্ত নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান। এরা একটি দেশের রাষ্ট্রীয় ভাষাকে ইউএনএলে রূপান্তর করার বিষয়ে অনুমোদন ও সহযোগিতা দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা বাংলাকে ইউএনএলের অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু করেছিল এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ। এ বিষয়ে গবেষণার জন্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ২০১০ সালে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে ২০১১ সালের ২০ জানুয়ারি ‘ইউনিভার্সাল ভাষায় পরিণত হচ্ছে বাংলা’ শিরোনামে কালের কণ্ঠে একটি রিপোর্টও প্রকাশিত হয়। তখন সোসাইটির সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম। এ কাজের জন্য সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারি অর্থ সহায়তার আশ্বাস না পাওয়ায় এবং সিরাজুল ইসলাম সোসাইটির দায়িত্ব শেষে ব্যক্তিগত গবেষণায় ফিরে গেলে প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম এখন বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক। তিনি জানান, একটি ভাষাকে ইউএনএলে পরিণত করতে হলে সে ভাষার মরফোলজিক্যাল গ্রামার ও মরফোলজিক্যাল ডিকশনারি তৈরি করতে হয়। সোসাইটির গবেষণা প্রকল্পের আওতায় কাজটি শুরু করা হয়েছিল। এ বিষয়ে কলকাতার একদল বাংলাভাষী আইটি বিশেষজ্ঞের সহায়তাও নেওয়া হয়। প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য একমাত্র অর্থ সংকটকেই তিনি দায়ী করতে রাজি নন। একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ এগিয়ে নেওয়ার মতো উদ্যোগের অভাবও এ ক্ষেত্রে প্রধানত দায়ী বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় উদ্যোগ থাকলে অর্থের সংকট হবে না।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে ইউএনএলে পরিণত করার উদ্যোগ ছিল একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এ কাজ সফল হলে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে বাংলা ভাষা অবারিত হতো। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক, বাংলাদেশের মহান শহীদ দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হলেও এবং বাংলা ভাষা জনসংখ্যা বিবেচনায় বিশ্বের চতুর্থ ভাষা হলেও এত দিন আমরা অন্য ভাষার মানুষের কাছে এ ভাষাকে বোধগম্য করে তুলতে পারিনি।’

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলা ভাষাকে ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তর করতে পারলে জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চায় আমরা ১০০ বছর এগিয়ে যাব। কিন্তু রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া কোনো ভাষাকে ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তর করা সম্ভব নয়। জাতিসংঘের যে প্রতিষ্ঠান ভাষাকে ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তর করার কাজ করে তাদের সঙ্গে কেবল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্র অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানই ওই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোনো ভাষাকে ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তর করতে চাইলে ২০ শতাংশ কাজ আগেই সম্পন্ন করে তারপর আবেদন করতে হয়। এ জন্য প্রয়োজনীয় প্রোগামটি ওপেন সোর্স হওয়ায় তা ইন্টারনেটে সবার জন্য সহজলভ্য। কিন্তু আমাদের এখানে কাজটি শুরু হলেও আগানো যায়নি। কারণ এটি এক-দুই বছরের কাজ নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্প নিতে হবে। ভাষা ও আইটি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়েই নিতে হবে প্রকল্প।’

এশিয়াটিক সোসাইটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষ সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু সেভাবে আমাদের ভাষার বিশ্বায়ন হয়নি। ভাষার বিশ্বায়ন চাইলে বাংলাকে ইউনিভার্সাল ভাষায় রূপান্তর করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমেরিকা, চীন ও জাপানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়ানো হচ্ছে অথচ আমরা বাংলার বিশ্বায়নের দিকে নজর দিচ্ছি না। একুশ এলে আমরা নাচানাচি করি, চলে গেলে আবার ভুলে যাই।’

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম ও অধ্যাপক জীনাত ইমতিয়াজ আলী মনে করেন, বাংলাকে ইউএনএলে পরিণত করতে চাইলে প্রথমত রাষ্ট্রকে উদ্যোগ নিতে হবে। এ জন্য হাতে নিতে হবে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্থায়ী গবেষণা প্রকল্প। তাঁদের মতে, এই কাজটি বাংলা একাডেমি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল, প্রধানমন্ত্রীর এটুআই প্রকল্প কিংবা যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে করানো যেতে পারে।

বাংলাকে ইউএনএলে রূপান্তরের রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তিনি আরো বলেন, ‘বাংলা সাহিত্যের অনুবাদের ওপর আমরা জোর দিচ্ছি। এবারের বইমেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আমরা আন্তর্জাতিক অনুবাদ সংস্থা আইপিএর সভাপতি, সাধারণ সম্পাদককে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছি।’
সুত্রঃ কালের কণ্ঠ

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *