মানুষের মধ্যে করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মেছে ধারণার চেয়ে বেশি

পূর্বের বিভিন্ন পরীক্ষায় একটি দেশের মানুষের শরীরে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে যতটা প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মেছে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি মানুষ সুরক্ষিত। এমনকি পরীক্ষার মাধ্যমে করোনাভাইরাস-বিরোধী অ্যান্টিবডি মানুষের শরীরে পাওয়া না গেলেও, তাদের শরীরেও কিছুটা প্রতিরোধ ক্ষমা থাকতে পারে। সুইডেনের একটি গবেষণার বরাতে এ খবর দিয়েছে বিবিসি।

খবরে বলা হয়, যত মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে, তাদের প্রায় দ্বিগুণ সংখ্যক মানুষের শরীরে ‘টি-সেল’ বা টি কোষ পাওয়া গেছে। এই কোষই করোনায় আক্রান্ত কোষকে চিহ্নিত করে ও ধ্বংস করে। কোভিড-১৯ আক্রান্ত তবে স্বল্পমাত্রার উপসর্গ বা একেবারেই উপসর্গহীন মানুষের শরীরেও এই টি-সেল পাওয়া গেছে।

তবে এই টি-সেল কি শুধু রোগীকে সুরক্ষিত রাখবে, নাকি পাশাপাশি ওই রোগী থেকে অন্যদের শরীরেও সংক্রমণ ঠেকিয়ে দেবে, তা স্পষ্ট নয়। সুইডেনের কারোলিঙ্কসা ইন্সটিটিউটের গবেষকরা ২০০ মানুষের শরীরে অ্যান্টিবডি ও টি-সেল উভয়ের উপস্থিতি শনাক্তের পরীক্ষা চালিয়েছেন।

এতে দেখা গেছে অ্যান্টিবডি না থাকলেও অনেকের শরীরে টি-সেলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। প্রতি ১ জন অ্যান্টিবডি-সমেত রোগির বিপরীতে দুইজন টি-সেল সমেত ব্যক্তি পাওয়া গেছে। এর অর্থ হলো, অ্যান্টিবডি উপস্থিতির ভিত্তিতে আগের পরীক্ষাগুলোতে যত মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মেছে বলে উঠে এসেছে, বাস্তবে এই সংখ্যা তার চেয়েও বেশি।

টি-সেল আছে, তবে অ্যান্টিবডি নেই, এই বিষয়টির একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে যে, এসব মানুষের শরীরে হয়তো অ্যান্টিবডি উৎপন্ন হওয়ার প্রয়োজন হয়নি।

অথবা হলেও তা মিইয়ে গেছে কিংবা বর্তমান যেসব পরীক্ষা রয়েছে, সেগুলোর মাধ্যমে এই অ্যান্টিবডি শনাক্তযোগ্য নয়। তবে এই মানুষগুলো যদি দ্বিতীয়বার ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ও, তারপরও তারা সুরক্ষিত থাকবেন।
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের অধ্যাপক ড্যানি অ্যাল্টম্যান বলেছেন, এই গবেষণা অত্যন্ত শক্তিশালী, নজরকাড়া ও পুঙ্খানুপুঙ্খ ছিল। তিনি বলেন, এমন প্রমাণ ক্রমেই বাড়ছে যে শুধুমাত্র অ্যান্টিবডি টেস্টিং এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি কতটা জন্মেছে, তার চিত্র কমই ফুটে ওঠে।

তবে এর মানে এই নয় যে বহুল-আলোচিত ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা গণ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মাবে মানুষের মধ্যে। গবেষণার অন্যতম লেখক ও সহকারি অধ্যাপক মার্কাস বাগার্ট বলেন, বেশি মানুষের মধ্যে কিছু না কিছু মাত্রার ইমিউনিটি রয়েছে, তা ঠিক। তবে তার মানে এই নয় যে আমরা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। তিনি বলেন, টি-সেল কতটা সুরক্ষা দেবে তা জানতে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। এই টি-সেল কি ভাইরাসকে বন্ধ্যা বা একেবারেই অচল করে দেবে; নাকি এর ফলে শুধু রোগি নিজেই সুরক্ষিত থাকবেন, তবে রোগির মাধ্যমে অন্যরা সংক্রমিত হবে—তা স্পষ্ট নয়।

অধ্যাপক বাগার্ট বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, কোভিড-১৯ রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা জন্মানোর বিষয়ে যত আলোচনা চলছে, তা অনেকটাই অ্যান্টিবডি নিয়ে। তার ভাষায়, অ্যান্টিবডি হলো অনেকটা মিসাইলের মতো। টার্গেট বা ভাইরাস যখন হামলা করতে আসবে, তখন এই অ্যান্টিবডি সেগুলোকে ধ্বংস করে। কোষে প্রবেশের আগেই ভাইরাসকে ধ্বংস ও নিষ্ক্রিয় করে দেয় অ্যান্টিবডি। তবে কোনো কারণে অ্যান্টিবডি যদি ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এই ভাইরাস কোষে প্রবেশ করে ফেলে। আর কোষই তখন ভাইরাস উৎপাদনের কারখানায় পরিণত হয়।

আর টি-সেল কাজ করে অ্যান্টিবডির পরে। অ্যান্টিবডি ব্যর্থ হলে ভাইরাস যখন কোষকে আক্রমণ করে, তখন আক্রান্ত কোষকে টার্গেট করে টি-সেল। সেসব কোষকে একেবারেই ধ্বংস করে ফেলে টি-সেল, যেন অন্যান্য সুস্থ কোষকে তারা সংক্রমিত করতে না পারে।

অ্যান্টিবডির মতো টি-সেলও শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অংশ। টি-বডিরও রয়েছে স্মরণ শক্তি। অর্থাৎ একবার যদি কোনো ভাইরাসকে ধরে ফেলতে পারে টি-সেল, তাহলে পরবর্তীতে ওই ভাইরাস আসলে প্রথমবারের চেয়ে আরও দ্রুততার সঙ্গে সেগুলোকে চিহ্নিত করে মেরে ফেলতে পারে টি-সেল। ফলে পরবর্তীতে ভাইরাসগুলো প্রথমবারের মতো আর সুবিধা করতে পারে না।

ইন্টার্লেউকিন ৭ নামে একটি ওষুধ মানুষের শরীরে টি-সেল উৎপাদন বাড়াতে পারে। এই ওষুধটি করোনায় আক্রান্তদের উপকারে আসে কিনা তা নিয়ে যুক্তরাজ্যে পরীক্ষা চলছে।

এর আগে লন্ডনের কিং’স কলেজ, সেইন্ট থমাস হাসপাতাল ও ফ্রান্সিস ক্রিক ইন্সটিটিউটের গবেষকরা এর আগে ৬০ জন গুরুতর অসুস্থ রোগীকে পরীক্ষা করে দেখেছেন, তাদের শরীরে টি-সেলের সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে যাচ্ছে।

তবে সুইডেনের গবেষণায় এমনটা দেখা যায়নি। সেখানে বলা হয়, রোগী যত অসুস্থ ছিল, তাদের শরীরে অ্যান্টিবডি ও টি-সেল উৎপাদনের মাত্রা তত বেশি ছিল।

কিন্তু তারা আরও বলছেন যে, এ বিষয়ে আরও অনেক গবেষণা দরকার। এখন পর্যন্ত টি-সেল নিয়ে এটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ গবেষণা। কিন্তু পরীক্ষাকৃত রোগির সংখ্যা তারপরও কমই ছিল।

টি-সেল খুবই জটিল। অ্যান্টিবডির তুলনায় এই কোষ আবিষ্কার করা অনেক কঠিন। এসবের জন্য বিশেষায়িত ল্যাব প্রয়োজন হয় ও একাধিক ব্যাচের নমুনা পরীক্ষা করতে হয়। ফলে এই মুহূর্তে গণহারে মানুষের শরীরে টি-সেলের উপস্থিতি শনাক্ত করা সম্ভব নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published.