আজ ১৪ ডিসেম্বর। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের মর্মন্তুদ এক দিন। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের হারানোর দুঃসহ যন্ত্রণার দিন। আজ থেকে ৪৩ বছর আগেকার এই দিনটি ইতিহাসের কলঙ্কিত একটি দিনও বটে।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের শেষলগ্নে বাঙালি জাতি যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরের সেই কালরাতে এ দেশীয় নরঘাতক রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে বর্বরোচিত বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞে। বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে বাঙালি মেধার নৃশংস নিধনযজ্ঞ গোটা বিশ্বকেই সেদিন হতবিহ্বল করে তুলেছিল।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ পৃথক বাণী দিয়েছেন। এসব বাণীতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের পাশাপাশি তাদের আত্মার শান্তি কামনা করেছেন তারা। দিবসটি উপলক্ষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীও বাণী দিয়েছেন।
এবারের বুদ্ধিজীবী দিবস এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। গত বছরের বুদ্ধিজীবী দিবসের আগেই জাতির বহুল আকাঙ্ক্ষিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত ধাপ পেরিয়ে শীর্ষস্থানীয় এক যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় কার্যকরের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির কলঙ্কমুক্তির সূচনা ঘটেছিল। বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের শোকাবহ আর বিজয়ের আনন্দবহ ডিসেম্বরেই কার্যকর হয়েছিল একাত্তরের অন্যতম শীর্ষ ঘাতক জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসির রায়।
আর এবার সেই কলঙ্কমুক্তি আরও কিছুটা পূর্ণতা পেয়েছে। আরও এক যুদ্ধাপরাধী বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞে জড়িত আলবদর বাহিনীর নেতা জামায়াতের আরেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের চূড়ান্ত বিচারের রায় কার্যকর এখন সময়ের ব্যাপার। খুব দ্রুত কার্যকর হতে পারে তার ফাঁসির রায়। আর এর আগে থেকেই বিচারের রায়ে দণ্ডিত হয়ে আছেন আরও কয়েকজন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী, যারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবী হত্যায়ও সরাসরি জড়িত।
অপেক্ষমাণ রয়েছে আরও কয়েকজনের বিচারের রায় ঘোষণাও। এ প্রেক্ষাপটে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সব যুদ্ধাপরাধীর বিচার শেষ ও রায় কার্যকরের মাধ্যমে কলঙ্কমুক্তির এ প্রক্রিয়ার শেষ হওয়াটাই এই মুহূর্তে গোটা জাতির প্রত্যাশা।পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু’দিন আগে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে ঘাতকচক্র কেবল ঢাকা শহরেই প্রায় দেড়শ’ বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশার কৃতী মানুষকে চোখ বেঁধে অপহরণ করে নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে। সান্ধ্য আইনের মধ্যে সেই রাতে তালিকা ধরে ধরে শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিসেবী ও পদস্থ সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তাদের ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরে হত্যা করে ফেলে রাখা হয় নিস্তব্ধ ভুতুড়ে অন্ধকারে।
পরদিন সকালে ঢাকার মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় হতভাগ্য এসব বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহ। এ যেন বাঙালির সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক নির্মম বধ্যভূমি। কারও শরীর বুলেটবিদ্ধ, কারও শরীর অমানুষিক নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত। হাত পেছনে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নাড়িভুঁড়িও বের করে ফেলা হয়েছিল অনেকেরই। আর ঘুম থেকে জেগে ওঠা স্বাধীনতা ছুঁইছুঁই উল্লসিত মানুষ স্বজন হারানোর সেই কালরাত্রির কথা জানতে পেরে শিউরে উঠেছিল।
তবে ১৪ ডিসেম্বরকে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞের দিন হিসেবে স্মরণ করা হলেও মূলত ১০ ডিসেম্বর থেকেই ইতিহাসের এ ঘৃণ্যতম অপকর্মের সূচনা হয়। সপ্তাহজুড়ে এদের তালিকায় একে একে উঠে আসে অসংখ্য বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী মানুষের নাম। হত্যার জন্য কৃতী এসব বুদ্ধিজীবীর তালিকা তুলে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডার গ্রুপ কুখ্যাত আলবদর ও আলশামস বাহিনীর হাতে। নেপথ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী। রাতের আঁধারে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা শুরু হয় ১০ ডিসেম্বর থেকেই, যার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন ঘটে ১৪ ডিসেম্বর।
একাত্তরে হত্যাযজ্ঞের শিকার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা আজও নিরূপণ করা যায়নি। তবে প্রাপ্ত বিভিন্ন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীর যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, সে অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ শিক্ষাবিদ, ১৩ সাংবাদিক, ৪৯ চিকিৎসক, ৪২ আইনজীবী এবং ১৬ জন শিল্পী-সাহিত্যিক-প্রকৌশলী। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন- ড. জিসি দেব, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য, ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, অধ্যাপক মনীরুজ্জামান, অধ্যাপক আনওয়ার পাশা, অধ্যাপক গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ডা. ফজলে রাব্বী, ডা. আলীম চৌধুরী, ড. গোলাম মোর্তজা, ড. মোহাম্মদ শফি, শহিদুল্লা কায়সার, সিরাজুদ্দীন হোসেন, নিজামুদ্দিন আহমদ, লাডু ভাই, খন্দকার আবু তালেব, আ ন ম গোলাম মোস্তফা, শহীদ সাবের, নাজমুল হক, আলতাফ মাহমুদ, নূতন চন্দ্র সিংহ, আরপি সাহা, আবুল খায়ের, রশীদুল হাসান, সিরাজুল হক খান, আবুল বাশার, ড. মুক্তাদির, ফজলুল মাহী, ড. সাদেক, ড. আমিনুদ্দিন, সায়ীদুল হাসান, হবিবুর রহমান, মেহেরুন্নেসা, সেলিনা পারভীনসহ আরও অনেকে।
আজকের কর্মসূচি: যথাযোগ্য মর্যাদা ও শোকের আবহে আজ পালিত হবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। শোকে আপ্লুত মানুষের ঢল নামবে বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মর্মন্তুদ যন্ত্রণার স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, রায়েরবাজার বধ্যভূমি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতিস্তম্ভে। অর্পণ করা হবে পুষ্পার্ঘ্য। স্বজনহারা মানুষের বুকের ভেতর চেপে রাখা কান্নায় ভিজে উঠবে বেদিমূল। ভিজে উঠবে স্বজনের জন্য আনা ভালোবাসার অর্ঘ্য। দেশের সর্বত্র আজ জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। শোকের প্রতীক কালো পতাকাও উড়বে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে সকাল সোয়া ৭টায় সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এর পর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা জানাবেন। এর পর সর্বসাধারণের পক্ষ থেকেও শ্রদ্ধা জানানো হবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি। রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধেও অনুরূপ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠিত হবে।
দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনও নিয়েছে নানা কর্মসূচি। এর মধ্যে আছে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্বেচ্ছায় রক্তদান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে রয়েছে সূর্যোদয়ের ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু ভবনসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৮টা ১০ মিনিটে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ৮টা ৪০ মিনিটে বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির জনকের প্রতিকৃতি ও ৯টা ১০ মিনিটে রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বিকেল ৩টায় রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা। দলের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
বিএনপি সূর্যোদয়ের ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকালে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন ছাড়াও বিকেলে আলোচনা সভার আয়োজন করবে।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টি, সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জেএসডি, গণতন্ত্রী পার্টি, গণফোরাম, বিকল্পধারা, ন্যাপ, বাসদ, গণতান্ত্রিক বাম মোর্চা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী), নতুনধারা বাংলাদেশ, এনডিএফ, জাতীয় গণতান্ত্রিক লীগ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, মওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ), বাংলাদেশ রুখে দাঁড়াও, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, এজাহিকাফ, মাশা, ফেইবসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে দিনটি পালন করবে।