গামিনি সিলভার কাছে নিশ্চয়ই উইকেটের রেসিপি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট। বাংলাদেশের লঙ্কান কিউরেটর সেই অনুযায়ীই রান্না করেছেন। অনেক দিন পর মিরপুরের কালচে উইকেট হয়ে উঠল ব্যাটসম্যানদের জন্য দুর্বোধ্য। কিন্তু যে ফাঁদ প্রতিপক্ষের জন্য পেতে রেখেছিল বাংলাদেশ, সেই ফাঁদে আটকা পড়ল তারাই। দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৪৮ রানের মধ্যেই থামিয়ে রাখা গেল বটে, কিন্তু নিজেরা পেরোতে পারল না এক শর ঘরও!
ভারতের বিপক্ষে চার পেসার খেলিয়েছিল বাংলাদেশ। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে চার স্পিনার। আক্রমণের শুরুটাও হলো দুই স্পিনারকে দিয়ে। আরাফাত সানির সঙ্গে ইদানীং ‘স্পেশালিস্ট’ হয়ে ওঠা নাসির চার ওভারে দুই ওপেনারকে ফিরিয়েও দিলেন। কিন্তু শেষ বাজিটা জিতল দক্ষিণ আফ্রিকাই। ২৯ ইনিংসে এর আগে একবারই পুরো চার ওভার হাত ঘুরিয়েছিলেন জেপি ডুমিনি। দুই বছর পর করলেন আজ আবার। এবং তিনিই দক্ষিণ আফ্রিকার সবচেয়ে সফল বোলার!
১১ রান দিয়ে ২ উইকেট। টানা দু্ই ওভারে ফেরালেন মুশফিক আর সাব্বিরকে। ২ উইকেটে ৫০ তুলে বাংলাদেশ যখন দারুণভাবে পাল্টা জবাব দিচ্ছে, সে সময় ডুমিনিই ছিটকে ফেলল প্রতিপক্ষকে। সাকিব আল হাসান, আরাফাত সানি, নাসির হোসেন ও সোহাগ গাজী—বাংলাদেশের চার স্পিনার ১৩ ওভারে ৯৬ রানে পেয়েছেন ৪ উইকেট। সেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার দুই স্পিনার অ্যারন ফাঙ্গিসো ও জেপি ডুমিনি ৮ ওভারে ৩২ রানে পেয়েছেন ৩ উইকেট। বাংলাদেশের স্পিনারদের ইকোনমি যেখানে ৭.৩৮, সেখানে প্রোটিয়াদের প্রায় অর্ধেক—৪। দক্ষিণ আফ্রিকার একটা উইকেট পেতে বাংলাদেশের স্পিনারদের দিতে হয়েছে ২৪ রান, প্রোটিয়াদের সেখানে ১০-এর মতো।
প্রতিপক্ষকে স্পিনে ধরাশায়ী করতে গিয়ে নিজেরাই স্পিনে নাকাল। ডুমিনির কিছু কিছু বল এত দুর্দান্ত টার্ন করল, টিভিতে খেলাটা দেখে থাকলে মুত্তিয়া মুরালিধরনও ‘নানরাকা সেইতু’ বলে হাততালি দিয়ে উঠতেন!
কিন্তু কেন এমন ফাঁদ পাতা হয়, যেখানে শিকারি নিজেই শিকার? মাশরাফি বিন মুর্তজার উত্তর, ‘সাধারণত আমাদের বোলারদের বল অত বেশি টার্ন করে না। আমাদের বল একটু উঁচু-নিচু, কখনোবা ধীরে যায়। কিন্তু আজ উইকেটে বেশ টার্ন ছিল। এতে একটু সমস্যা হয়েছে। ওদের স্পিনাররা ৮ ওভারে ৩২ রান দিয়েছে। তিনটা উইকেটও পেয়েছে। তবে উইকেটে যা-ই হোক না কেন, ১৪৯ রান তাড়া করার ক্ষেত্রে আমাদের আরও ভালো খেলা উচিত ছিল।’
মাশরাফিদের চাহিদাপত্রে নাকি এমন উইকেট ছিলও না! টার্নিং নয়, মাশরাফিরা চেয়েছিলেন এমন উইকেট, যেখানে বল ব্যাটে যাবে ধীরে। কখনো কখনো নিচু হয়ে যাবে। তার পরও স্পিনটা দক্ষিণ আফ্রিকা যেভাবে সামলেছে, বাংলাদেশ তা পারেনি। মাশরাফি মনে করেন, ‘ওদের স্পিনাররা ভালো করেছে। আমাদের স্পিনাররাও ভালো করেছে। তবে ওরা আমাদের স্পিনারদের যেভাবে সামলেছে, আমরা সেভাবে পারিনি। এখানেই ম্যাচের পার্থক্য গড়ে দিয়েছে।’
পার্থক্য গড়ে দিয়েছেন আরও একজন। ৯০ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ফেলা দক্ষিণ আফ্রিকাকে পথ দেখিয়েছেন ফ্যাফ ডু প্লেসি। সামনে থেকেই নেতৃত্ব দিয়েছেন টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। এই ডু প্লেসি কদিন আগে বলেছিলেন, আইপিএলে খেলার অভিজ্ঞতা কাজে লাগাবে তাঁর দল। মাশরাফিরও মনে হলো, ‘এমন স্পিন আক্রমণের মধ্যেও ডু প্লেসি শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং করেছে। মূলত চেন্নাইয়ের (আইপিএলে) হয়ে খেলায় ও এ ধরনের উইকেট-কন্ডিশনের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এ কারণে স্পিনটা ভালোভাবে সামলেছে। ফ্যাফকে আরও আগে আউট করতে পারলে ১০-১৫ রান কম হত।’
৬ ওভারে বাংলাদেশ করল ২ উইকেটে ৩৭ রান। একই অবস্থা ছিল দক্ষিণ আফ্রিকারও। যতই টার্ন থাকুক, বাংলাদেশের জন্য তো এমন উইকেট নতুন নয়। তবুও কেন পেরে উঠলেন না মাশরাফিরা? অবশ্যই এর জন্য ব্যাটসম্যানরা কম দায়ী নন। অনেকেই আত্মঘাতী শট খেলে নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে এসেছেন।
মাশরাফি অবশ্য আগলে রাখলেন সতীর্থদের, ‘নাসির যখন ব্যাটিংয়ে গেল, প্রয়োজনীয় রান গড় আটের ওপর চলে গিয়েছিল। তবুও বলব আমরা একটু বেশি শট খেলেছি। গত কয়েক ম্যাচে আমরা ইতিবাচক খেলেই সাফল্য পেয়েছি। এ কারণে অনেকে খেলার ধরন পরিবর্তন করতে চায়নি। তবে পরিস্থিতি বুঝে খেলা উচিত। আশা করি, পরের ম্যাচগুলোয় পরিস্থিতি বিবেচনা করেই ব্যাটসম্যানরা খেলবে।’
সেটাই বড় কথা। আটটি চার মেরেছেন ডু প্লেসি। কিন্তু এমনও একটা সময় গেছে, যখন টানা ১৯ বলের (তিন ওভারেরও বেশি) মধ্যে চার মেরেছেন মাত্র দুবার। পরিস্থিতি বোঝাটাই আসলে গড়ে দেয় পার্থক্য।
