নিউজ ডেস্ক, সম্পাদনায়-সাইমুর রহমান:
নির্বাচন-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান যে ভাষ্য তুলে ধরেছেন, তা মূলত একটি রাজনৈতিক রূপরেখা। সেখানে ছিল নিরাপদ, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণের অঙ্গীকার; ছিল ঐক্যের ডাক; ছিল অর্থনীতি থেকে পররাষ্ট্রনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পরিকল্পনার ইঙ্গিত।
প্রশ্ন হচ্ছে-এই ঘোষণাগুলো কি রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবায়নের পথে এগোবে?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস বিভাজন, অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার চর্চায় ভারাক্রান্ত। এমন প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের ‘হাতে হাত রেখে এগোনোর’ আহ্বান কেবল দলীয় কর্মসূচি নয়; এটি জাতীয় পুনর্গঠনের এক প্রস্তাব।
গণতন্ত্র কেবল ভোটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় না। এটি টিকে থাকে বিরোধী দলের শক্তিশালী, যুক্তিনিষ্ঠ ভূমিকার ওপর, এটি টিকে থাকে সমালোচনাকে গ্রহণ করার রাজনৈতিক পরিপক্বতায়। সংসদে যদি মতবিরোধ থাকে কিন্তু তা যুক্তির ভাষায় প্রকাশ পায়, তবেই রাষ্ট্রযন্ত্র সুস্থ প্রতিযোগিতার ভেতর দিয়ে এগোয়।
তারেক রহমানের ভাষণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা, এবং জাতীয় স্বার্থভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতির অঙ্গীকার ছিল। এগুলো নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী।
কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। নির্বাচন-উত্তর সহিংসতা, আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতা, সামাজিক অস্থিরতা-এসব প্রশ্ন এখনও সামনে। বিদেশি পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে নির্বাচন প্রতিযোগিতামূলক হলেও, সমাজে যদি অনিরাপত্তা থেকে যায়, তবে সেই সাফল্য আংশিক হয়ে পড়ে।
গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় ক্ষমতা গ্রহণের পর। বিরোধী মতকে কতটা জায়গা দেওয়া হয়, প্রশাসন কতটা নিরপেক্ষ থাকে, আইনের শাসন কতটা কার্যকর হয়-এসবই নির্ধারণ করে সরকারের চরিত্র।
নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে যে আলোচনা চলছে-নবীন ও অভিজ্ঞদের মিশ্রণ, শরিকদের অংশগ্রহণ, টেকনোক্র্যাট অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনা-তা একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হতে পারে।
অভিজ্ঞতা যেমন নীতিনির্ধারণে স্থিরতা আনে, তেমনি তারুণ্য নতুন চিন্তা ও গতি দেয়। তবে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা।
তারেক রহমান শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার যে অঙ্গীকার করেছেন, সেটিই নতুন সরকারের জন্য প্রথম পরীক্ষা। সমাজ যদি সহিংসতা ও ভয়ের মধ্যে থাকে, তবে উন্নয়ন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান-সবই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
নির্বাচনের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে কার্যকর ভূমিকা দেখা গেছে, তা প্রমাণ করে-সদিচ্ছা থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এখন প্রয়োজন সেই ধারাবাহিকতা।
একটি পরিণত গণতন্ত্রে বিরোধী দল কেবল সমালোচক নয়; তারা বিকল্প ভাবনার ধারক। সরকার যদি কোনো পরিকল্পনা উপস্থাপন করে, সেখানে ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া বিরোধী দলের দায়িত্ব।
তারেক রহমানের ঘোষিত পরিকল্পনায় যদি সংশোধনের প্রয়োজন থাকে, সেই দায়িত্ব বিরোধী দলকে পালন করতে হবে। ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, নীতিনির্ভর বিতর্কই হওয়া উচিত সংসদের চর্চা।
বাংলাদেশ এখন এক সন্ধিক্ষণে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতার পর মানুষ চায় স্থিতি, নিরাপত্তা ও উন্নয়ন। ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’-এই ঘোষণা তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনে রূপ নেবে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার একটি প্রক্রিয়া এটি একক কোনো দলের কর্মসূচি নয়। সরকার, বিরোধী দল, প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজ-সবার সম্মিলিত প্রয়াসেই তা সফল হয়।
জনগণের প্রত্যাশা হচ্ছে ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও মর্যাদা। নতুন সরকার যদি এই চার ভিত্তির ওপর রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে পারে, তবেই অঙ্গীকারের ভাষণ ইতিহাসে স্থান পাবে। অন্যথায়, ঘোষণাগুলো কেবল রাজনৈতিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক
