ঋণ পরিশোধের সময় ঋণগ্রহীতা যদি স্বেচ্ছায় মূল টাকার সঙ্গে কিছু অতিরিক্ত অর্থ দেন, সেটি কি সুদ হিসেবে গণ্য হবে? আবার ঋণ নেওয়ার পর ঋণদাতাকে কোনো উপহার দেওয়া বা ঋণদাতার সেই উপহার গ্রহণ করার বিধানই–বা কী? ইসলামি শরিয়তে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে।
স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত অর্থ দিলে কি সুদ হবে?
ইসলামী শরিয়ত অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধের সময় যদি ঋণগ্রহীতা কোনো পূর্বশর্ত, প্রতিশ্রুতি বা চাপ ছাড়াই সন্তুষ্টচিত্তে অতিরিক্ত কিছু অর্থ দেন, তাহলে সেটি সুদ হিসেবে গণ্য হবে না। এ ধরনের অতিরিক্ত প্রদান হাদিয়া হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তা গ্রহণ করাও বৈধ।
এ প্রসঙ্গে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে একজন ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট বয়সের উট পাওনা ছিল। ওই ব্যক্তি পাওনা চাইতে এলে নবীজি (সা.) সাহাবিদের একটি উট দিতে নির্দেশ দেন। কিন্তু একই বয়সের উট না পাওয়ায় তুলনামূলক বেশি বয়সের একটি উট দেওয়া হয়। এরপর রাসুল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে সবচেয়ে সুন্দরভাবে (ঋণ ও অন্যের হক) পরিশোধ করে।’ (সহিহ বুখারি: ২৩৯৩)
কখন অতিরিক্ত অর্থ সুদে পরিণত হয়?
অন্যদিকে, ঋণ নেওয়ার সময় যদি এ শর্ত থাকে যে পরিশোধের সময় মূল অর্থের সঙ্গে অতিরিক্ত টাকা দেওয়া হবে, অথবা ঋণগ্রহীতা আগে থেকেই প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি বাড়তি অর্থ পরিশোধ করবেন, তাহলে সেই অতিরিক্ত অর্থ সুদ হিসেবে গণ্য হবে।
হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ঋণ থেকে কোনো ধরনের অতিরিক্ত সুবিধা বা লাভ অর্জিত হয়, তা সুদি ঋণ।’ (বুলুগুল মারাম: ৮৬১)
সুদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই গুনাহগার
ইসলামে শুধু সুদ গ্রহণ বা প্রদানই নয়, সুদি লেনদেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের সহযোগিতাও নিষিদ্ধ।
হজরত জাবের (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহণকারী, সুদদাতা, সুদের চুক্তি লিখে দেওয়া ব্যক্তি এবং এর সাক্ষীদের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, ‘তারা সবাই সমান অপরাধে জড়িত।’ (সহিহ মুসলিম: ৪১৭৭)
ঋণগ্রহীতার দেওয়া উপহার গ্রহণ করা যাবে?
শরিয়তের দৃষ্টিতে ঋণদাতার জন্য ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে কোনো ধরনের সুবিধা দাবি করা, প্রত্যাশা করা বা পরোক্ষভাবে আদায় করার চেষ্টা করা বৈধ নয়। একইভাবে ঋণের মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ঋণগ্রহীতা যদি কোনো উপহার দেন, সেটিও গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কারণ, এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
তবে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে। যদি ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার মধ্যে আগে থেকেই পারিবারিক বা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকে এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত উপহার আদান-প্রদানের প্রচলন থাকে, পাশাপাশি উপহারটি যে ঋণের বিনিময়ে দেওয়া হচ্ছে না—এ বিষয়টি স্পষ্ট থাকে, তাহলে সে উপহার গ্রহণ করা বৈধ।
হাদিসে উপহার গ্রহণের নির্দেশনা
ইয়াহইয়া ইবনে আবু ইসহাক আল-হানাঈ (রহ.) বর্ণনা করেন, তিনি হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ঋণ দেওয়ার পর ঋণগ্রহীতা যদি কোনো উপহার দেয়, তাহলে এর বিধান কী?
জবাবে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের কেউ যদি কাউকে ঋণ দেয়, এরপর ঋণগ্রহীতা তাকে কোনো উপহার দেয় বা নিজের বাহনে চড়তে আমন্ত্রণ জানায়, তাহলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। তবে যদি আগে থেকেই তাদের মধ্যে এ ধরনের সৌজন্যমূলক আদান-প্রদানের প্রচলন থাকে, তাহলে এতে সমস্যা নেই।’ (সুনানে ইবনে মাজা: ২৪৩২)
ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি
ইসলামে ঋণকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবিক সহমর্মিতার একটি মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়েছে, লাভের উপকরণ হিসেবে নয়। তাই ঋণ পরিশোধের সময় স্বেচ্ছায় অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া বৈধ হলেও, যদি তা পূর্বশর্ত, প্রতিশ্রুতি বা ঋণের বিনিময়ে নির্ধারিত সুবিধার অংশ হয়, তাহলে সেটি সুদ হিসেবে গণ্য হবে এবং শরিয়তে তা সম্পূর্ণ হারাম।
ইসলাম ধর্ম ঋণ