বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এলএলবি/এলএলএম পরীক্ষার সার্টিফিকেট নিয়ে ‘ঝামেলা’ রয়েছে— এমন কারণ দেখিয়ে আইনজীবী হিসেবে (অ্যাডভোকেটশিপ অথবা এনরোলমেন্ট পরীক্ষা) তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় অংশ নিতে বারণ করছে বার কাউন্সিল। অবশ্য লিখিত নয়, মৌখিক আদেশের মাধ্যমেই পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের রেজিস্ট্রেশন ফরম দেয়া হচ্ছে না। দেশে মোট ৭৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ৩৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগ আছে। বার কাউন্সিলে অভিযোগ রয়েছে, এই ৩৩টির মধ্যে সাতটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেটে ‘ঝামেলা’ রয়েছে। এই সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট পাওয়া যায়, পড়াশোনা না করলেও চলে। সাতটি বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে দারুল ইহসান, প্রাইম, নর্দান, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল, আমেরিকা বাংলাদেশ, অতীশ দীপঙ্কর ও ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়। অবশ্য এই সাত বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই সাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অপকর্মে’র কারণে বার কাউন্সিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে বলেছিল, দেশের যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা এলএলবি/এলএলএম ডিগ্রি নিয়েছেন, তাদের তালিকা পাঠাতে। কিন্তু ইউজিসি এ তালিকা পাঠাতে অস্বীকার করেছে। এ রকম পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রিধারীদের ‘অ্যাডভোকেটশিপ’ পরীক্ষায় অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখতে চেয়েছে বার কাউন্সিল। অর্থাৎ এই সাতটির কারণে বাকি ২৬ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপরও একই সিদ্ধান্ত আরোপ করা হয়েছে। ৩৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে প্রায় ৪০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে প্রায় আট হাজার শিক্ষার্থী এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে এই সময়ে পরীক্ষায় অংশ নেয়ার রেজিস্ট্রেশন করতে পারবে না— এমন খবরে তারা উদ্বিগ্ন।
বার কাউন্সিলের সচিব মো. আলতাফ হোসেন গতকাল বর্তমানকে বলেন, কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শীঘ্রই একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হবে। এই বিজ্ঞপ্তিতেই বলা থাকবে কারা, কীভাবে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে অথবা পারবে না। ‘গণবিজ্ঞপ্তি’তে কী থাকছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বার কাউন্সিলের তথ্য কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলতে পারবেন।
তথ্য কর্মকর্তা নাজমুল হোসেন বলেন, প্রায়ই অভিযোগ শোনা যায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সনদ-বাণিজ্য চলছে। একজন শিক্ষার্থী সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বছর পড়াশোনা করে এলএলবি ডিগ্রি পাবেন, অন্যদিকে আরেকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা না করেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই ডিগ্রি পাবেন— এটা কি ঠিক? এজন্য কাউন্সিল থেকে ইউজিসিকে চিঠি পাঠিয়ে বলা হয়েছিল দেশের যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছে, তাদের তালিকা যাচাই করে পাঠাতে। কিন্তু ইউজিসি তা করেনি। ফলে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে মৌখিকভাবে বারণ করা হয়েছে। এ সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে— জানতে চাইলে তিনি বলেন, গণবিজ্ঞপ্তি প্রস্তুত করা হচ্ছে। এটি জারি হলেই বোঝা যাবে পরীক্ষায় কীভাবে অংশ নেয়া যাবে। গণবিজ্ঞপ্তিতে লেখা থাকবে— যে সব শিক্ষার্থী আইনে স্নাতক ডিগ্রি নিয়েছে, তাদের তালিকা স্ব স্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বার কাউন্সিলে পাঠাবে। তারপর কাউন্সিল তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে বার কাউন্সিলের এমন সিদ্ধান্তে হতাশা প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী। তিনি গতকাল বর্তমানকে বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে কোথাও ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। তবু ইউজিসির কোনো করণীয় থাকলে শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তা করা হবে। বার কাউন্সিল বলছে— এ বিষয়ে ইউজিসিকে চিঠি পাঠানো হলেও জবাব দেয়া হচ্ছে না— এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা আদৌ চিঠি পাঠিয়েছিল কি না, তা আমি জানি না। কাল (আজ সোমবার) অফিসে গিয়ে এটির বিষয়ে খোঁজ নেব।’
অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সমস্যা নেই, ৪-৫টিতে কিছু সমস্যা রয়েছে। এ কারণে শিক্ষার্থীদের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেয়া দুর্ভাগ্যজনক। কারণ যারা যোগ্য তারাই তো পরীক্ষায় পাস করবে।
বার কাউন্সিলের তথ্য বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে মামলা, সার্টিফিকেট বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তাই সম্প্রতি তাদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হচ্ছে না। তবু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারীদের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে বার কাউন্সিল থেকে ইউজিসিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের স্নাতক ডিগ্রিধারী শিক্ষার্থীদের তালিকা চেয়ে চিঠি দেয়া হয়। শিক্ষার্থীদের তালিকা পাওয়ার পরই পরীক্ষা দিতে দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। কিন্তু পর পর দুবার বার কাউন্সিল থেকে চিঠি দেয়ার পরও ইউজিসি আমলে নেয়নি।
সম্প্রতি ইউজিসি বার কাউন্সিলে চিঠি পাঠিয়ে বলেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি/এলএলএম প্রোগ্রামে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিলে এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় নিবন্ধনের ব্যাপারে মঞ্জুরি কমিশন থেকে তালিকা পাঠানো সম্ভব নয়। এ ছাড়া উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকা কমিশনের পক্ষে যাচাই করাও সম্ভব নয়। কারণ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি, রেজিস্ট্রেশন, পরীক্ষা, ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট ইত্যাদি বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কার্যক্রমের আওতায় আছে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, বার কাউন্সিলের চিঠির উত্তরে ইউজিসি এমন জবাব দেয়ায় গ্যাঁড়াকলে পড়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন বিভাগ থেকে এলএলবি/এলএলএম ডিগ্রি নেয়া শিক্ষার্থীরা। তারা এখন চোখেমুখে অন্ধকার দেখছে। একাধিক শিক্ষার্থী বলেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনুমতি নিয়েই প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে। আমরা তা দেখেই ভর্তি হয়েছি। চার বছর অনার্স করার পর এখন কেন আইনজীবী হওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে বুঝতে পারছি না।’ এ রকম পরিস্থিতিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও হতাশা বিরাজ করছে।
বার কাউন্সিলের পরীক্ষায় অংশ নেয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কী ভূমিকা রয়েছে জানতে চাইলে স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার একরামুল হক চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ‘কোন সমস্যার কারণে আমাদের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে দেয়া হচ্ছে না, তা আমাদের জানানো হয়নি। এমনকি এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে কোনো প্রকার নোটিসও দেয়া হয়নি। তবু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুনে আমরা বার কাউন্সিলে গিয়েছিলাম। বার কাউন্সিল বলেছে খুব দ্রুতই এ বিষয়ে সমাধান হবে। কিন্তু পরে জানতে পারলাম, তারা এখন এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশ নিতে দিচ্ছে না।’
নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের যুগ্ম রেজিস্ট্রার আবুল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বার কাউন্সিলে পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেয়ার ব্যাপারে কোনো চিঠি আমাদের দেয়া হয়নি। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) আইন কিংবা বিধিতেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করতে দেয়া হবে না মর্মে কোনো কিছু বলা নেই।’ তিনি বলেন, আমাদের কোনো নোটিস না দিয়ে বার কাউন্সিল ও ইউজিসি মিলে গোপনে ভুতুড়ে নিয়ম করে আমাদের ছাত্রছাত্রীদের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে না দেয়াটা সম্ভবত অসৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা বার কাউন্সিল ও ইউজিসিকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। যদি তারা এটার সমাধান না করে তাহলে আইনগতভাবে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে ইউজিসির সিনিয়র সহকারী সচিব মৌলি আজাদ বলেন, ‘আমি তো জানি শুধু দারুল ইহসানের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে দেয়া হচ্ছে না। অন্য কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে অংশগ্রহণে বাধা দেয়া হচ্ছে কি না, সে বিষয়ে কোনো কিছু জানি না।’
ইউজিসির বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিভাগের পরিচালক মো. সামছুল আলম বলেন, ‘বার কাউন্সিলের চিঠির জবাবে আমরা বলেছি, আমাদের পক্ষে এত ছাত্রছাত্রীর তালিকা দেয়া সম্ভব নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বার কাউন্সিলে শিক্ষার্থীদের তালিকা পাঠানো কমিশনের দায়িত্ব নয়। এ ছাড়া কমিশনের পক্ষে এত শিক্ষার্থীর তালিকা তৈরি করাও সম্ভব নয়।’
বার কাউন্সিল কমিশনের তালিকা ছাড়া এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে দেবে না, আর কমিশনের পক্ষে তালিকা দেয়া সম্ভব নয়, এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কী হবে— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আশা করি বার কাউন্সিল বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জীবনের কথা চিন্তা করে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে।’ বর্তমান