torphyটেস্টের পর ওয়ানডে সিরিজেও জিম্বাবুয়েকে ধবলধোলাইয়ের লজ্জায় ডুবিয়েছে বাংলাদেশ। ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার পর সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সিরিজের পঞ্চম ও শেষ ওয়ানডেতে ৫ উইকেটের বড় জয় তুলে নিয়েছে স্বাগতিকরা।
হারের বৃত্ত থেকে বেরোতে সিরিজে প্রথমবারের মতো টসে জিতে ব্যাটিং বেছে নিয়েছিলেন জিম্বাবুয়ের অধিনায়ক এল্টন চিগুম্বুরা। তাদের শুরুটাও ছিল দারুণ। হ্যামিল্টন মাসাকাদজা-ভুসি সিবান্দারা অতিথিদের দেখাচ্ছিলেন বড় সংগ্রহের স্বপ্ন। কিন্তু স্পিনারদের কাঁধে চড়ে হঠাৎই দারুণভাবে ম্যাচে প্রত্যাবর্তন স্বাগতিকদের। অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করে তাইজুল ইসলামের ইতিহাস, সাকিব আল হাসান আর জুবায়ের হোসেন লিখনের স্পিন বিষে নীল জিম্বাবুয়ে ৩০ ওভারেই অলআউট ১২৮ রানে। তবে অনায়াস জয়ের পথটাও অবশ্য অনায়াসে পাড়ি দিতে পারেনি স্বাগতিকরা। ১২৯ রানের লক্ষ্যে পেঁৗছতেই খোয়াতে হয়েছে ৫টি উইকেট।
টেস্টে জিম্বাবুয়েকে ধবলধোলাইয়ের পর বাংলাদেশের জয়োৎসবটা ঠিক পরিপূর্ণতা পায়নি। কারণ, জয়ের স্মারক ট্রফিটা তখন দেয়া হয়নি তাদের। তখনই জানা গিয়েছিল, ট্রফিটা ওয়ানডে সিরিজের পরই বিশেষ কোনো ব্যক্তি তুলে দেবেন বিজয়ী দলের হাতে। সেই বিশেষ কেউ হয়ে সোমবার মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই ওয়ানডে সিরিজের ট্রফির সঙ্গে টেস্ট সিরিজ জয়ের ট্রফিটাও তুলে দিয়েছেন মাশরাফি-মুশফিকদের হাতে। এমন দিনে উৎসবে কি আর কমতি থাকে। রইলোও না। আর স্বাগতিকদের সেই উৎসবের মধ্যমণি হয়ে রইলেন কিন্তু ম্যাচসেরা তাইজুল।
টেস্ট সিরিজে ১৭টি উইকেট নেয়ার পর আর নিজেকে নতুন করে প্রমাণের কিছু ছিল না তাইজুলের। তারপরও বিশ্বকাপের আগে ওয়ানডে ক্রিকেটেও বাঁহাতি এই স্পিনারকে একটু বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলেন নির্বাচকরা। আর ওয়ানডে ইতিহাসে প্রথম বোলার হিসেবে অভিষেকেই হ্যাটট্রিকের ইতিহাস গড়ে সেই সুযোগটা নিলেন উদীয়মান এই তরুণ। ম্যাচে তার বোলিং ফিগারটাও অসাধারণ। ৭ ওভার হাত ঘুরিয়ে ২টি মেডেনসহ মোটে ১১ রান খরচায় নিয়েছেন ৪টি উইকেট, যা হয়ে রইল অভিষেকে বাংলাদেশি কোনো বোলারের সেরা পারফরম্যান্স।
আগের ওয়ানডেতে অভিষিক্ত জুবায়ের হোসেন লিখনও এদিন ৪১ রান খরচায় ২ উইকেট নিয়ে জানিয়ে দিলেন, ওয়ানডে ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জটা নিতে তিনিও প্রস্তুত। আর তিন উইকেট পাওয়া সাকিব তো পরীক্ষিত সৈনিকই। স্বাগতিকদের এই স্পিনত্রয়ীর সাঁড়াশি আক্রমণে রীতিমতো ওষ্ঠাগত জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের প্রাণ। টেইলর-মায়ার-মারুমারা ব্যস্ত রইলেন আসা-যাওয়ার মিছিলে। দেখে মনে হচ্ছিল যেন, দেশে ফেরার জন্য আর তর সইছে না তাদের। যেন প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন, কে কার আগে আউট হতে পারেন!
অথচ দিনের শুরুটা জিম্বাবুয়ের জন্য ছিল দারুণ। সিরিজে সেরা শুরুটাই পেয়েছিল তারা। পঞ্চম ওভারে মাশরাফিকে উইকেট উপহার দিয়ে দলীয় ১৬ রানের মাথায় সিকান্দার রাজা ফিরলেও মাসাকাদজা আর সিবান্দার ব্যাট স্বাগতিক বোলারদের ওপর ছড়ি ঘোরাচ্ছিল নির্বিঘ্নে। দ্বিতীয় উইকেটে দুজনের ৮৯ রানের জুটিতে বড় পুঁজি গড়ার ভিতটা পেয়ে গিয়েছিল অতিথিরা। কিন্তু পরবর্তী ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় সিরিজে সর্বনিম্ন স্কোর গড়ে থামতে হয়েছে তাদের।
সাবলীল ব্যাটিংয়ে এগিয়ে যাওয়া মাসাকাদজা-সিবান্দা জুটি স্বাগতিকদের জন্য দেখা দিয়েছিল হুমকি হয়ে। ৯৫ রানের মাথায় অতিথিদের ইনিংসের একমাত্র হাফসেঞ্চুরিয়ান মাসাকাদজাকে (৫২) বোল্ড করে স্বাগতিক শিবিরে স্বস্তি ফিরিয়েছেন জুবায়ের। অবশ্য জুটিটা ভেঙে যেতে পারত আরো আগেই। কিন্তু জুবায়েরের বলেই মাশরাফি সিবান্দার ক্যাচ ফেলে দেয়ায় তা আর হয়নি। পরে সাকিবের বলে সিবান্দার ক্যাচটা নিয়েছেন টাইগার দলপতিই। তার আগেই সাকিব বোল্ড করে ফিরিয়ে দিয়েছেন ব্রেন্ডন টেইলরকেও।
দলীয় ১১২ রানের মাথায় জুবায়েরের বলে টিমিসেন মারুমা বোল্ড হয়ে সাজঘরে ফেরার পর আর ধাক্কা সামলে উঠতে পারেনি জিম্বাবুয়ে। আসলে সামলে উঠতে দেননি তাইজুল। মাত্র ৮ বলের ব্যবধানে এই স্পিনার ৪ উইকেট তুলে নিয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংসটাকে বানিয়ে দিয়েছেন ধ্বংসস্তূপ। নিজের ষষ্ঠ ওভারের প্রথম বলেই তিনি এলবিডবিস্নউর ফাঁদে ফেলেছেন সলোমন মায়ারকে। ওই ওভারেরই শেষ বলে তার শিকার তিনাশে পানিয়াঙ্গারা।
পরের ওভারের প্রথম দুই বলে জন নিয়াম্বু আর তেন্দাই চাতারাকে আউট করে তাইজুল পূর্ণ করেছেন হ্যাটট্রিক। বাংলাদেশের ২৮ বছরের ওয়ানডে ইতিহাসে শাহাদাত হোসেন রাজীব, আবদুর রাজ্জাক আর রুবেল হোসেনের পর চতুর্থ বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিকের নজির গড়লেন তিনি। এরপর কামুঙ্গোজিকে মাহমুদউল্লাহর ক্যাচ বানিয়ে জিম্বাবুয়ের ইনিংসের ইতি টেনে দিয়েছেন সাকিব। অপর প্রান্তে অসহায় দলপতি এল্টন চিগুম্বুরা ঠায় দাঁড়িয়ে দেখলেন দলের দুরবস্থা। কিছুই যে করার ছিল না তার।
স্পিনারদের দুর্দান্ত বোলিংয়ের পর এদিন বাংলাদেশের জয়টা ছিল সময়ের অপেক্ষা। দ্রুত কয়েকটি উইকেট হারিয়ে একসময় অস্বস্তিতেই পড়ে গিয়েছিল স্বাগতিকরা। তবে সাবি্বর রহমান রুম্মানকে নিয়ে সেটা কাটিয়ে ঠিকই দলকে জয়ের বন্দরে পেঁৗছে দিয়েছেন দুরন্ত ছন্দে থাকা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। টানা দ্বিতীয় আর ক্যারিয়ারের একাদশ হাফসেঞ্চুরি তুলে অপরাজিত ছিলেন ৫১ রানে। ১০টি চারে তার ৫৫ বলের ইনিংসের সুবাদেই বাংলাদেশ ম্যাচের ইতি টেনেছে ২৪.৩ ওভারে।
তবে তামিম-এনামুল-সৌম্য-সাকিব-মুশফিকরা যেভাবে আউট হলেন, সেটাও কিন্তু কারো কাম্য নয়। তারা একটু ধৈর্য নিয়ে খেললে জয়টা আরো সুন্দর হতে পারত বাংলাদেশের। ব্যক্তিগত অর্জনের ঝুলিটাও আরো সমৃদ্ধ হতো তাদের। সাকিব আর তামিমের সামনে তো ছিল ৪ হাজার রানের মাইলফলক ছোঁয়ার সুযোগ। কিন্তু দলীয় ১৮ রানের মাথায় পানিয়াঙ্গারার বলে মায়ারকে ক্যাচ দিয়ে সেই সুযোগ নষ্ট করেছেন তামিম (১০)। আর ৫৮ রানের মাথায় চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ওই পানিয়াঙ্গারার বলেই মাসাকাদজাকে ক্যাচ দিয়ে ফিরেছেন সাকিব (০)।
ছন্দে থাকা অপর ওপেনার এনামুল হক বিজয় টানা দুই ম্যাচে ব্যর্থ (৮)। ইমরুলের জায়গায় দলে আসা অভিষিক্ত সৌম্য সরকার অবশ্য শুরুটা করেছেন দারুণভাবে। কিন্তু ১৮ বলে ৪টি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ফিরেছেন ২০ রানে। দুজনই উইকেট দিয়েছেন তেন্দাই চাতারাকে। ৫৮ রানে ৪টি উইকেটের পতনের পর মাহমুদউল্লাহর সঙ্গে ৩৫ রানের ছোট্ট জুটি গড়ে ওই চাতারার বলেই ফিরেছেন মুশফিক (১৫)। অন্যসব ম্যাচ হলে তাদের এসব আউট নিয়ে যথেষ্টই কাটাছেঁড়া হতো। কিন্তু জয়ের সঙ্গে প্রতিপক্ষকে ধবলধোলাইয়ের আনন্দ উৎসবে ওসব মনে রাখার সময় কোথায়?

post by ashiqur rahman swadeshnews24.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *