রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি প্রতিযোগিতার দৌড়ে ছিল না। সেখানে বিএনপি যে তৃতীয় অবস্থানে থাকবে এবং তারা খুবই কম ভোট পাবে এটা নিশ্চিত ছিলো। প্রতিযোগিতা হবার কথা ছিলো জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে। নির্বাচনের আগেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিলো জাতীয় পার্টি জিতবে।

তবে অনেকের ধারণা ছিলো বড় ধরনের প্রতিযোগিতা হবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাতীয় পাটির। নির্বাচনের ফল থেকে দেখা গেলো আওয়ামী লীগের সঙ্গে ওই অর্থে কোন প্রতিযোগিতাই হয়নি। জাতীয় পার্টি একতরফা নির্বাচনে জিতেছে।

নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর আওয়ামী লীগের জেনারেল সেক্রেটারি ওবায়দুল কাদের বলেছেন, রংপুরে গণতন্ত্র বিজয়ী হয়েছে। মি. কাদেরের এ বক্তব্য মুখ রক্ষার বক্তব্য। তবে এই বক্তব্য তার দলের মুখ রক্ষা করে না। কারণ, আওয়ামী লীগ কোন স্বৈরাচারী দল না, তার সরকারও কোন স্বৈরাচারী সরকার নয়। তাই কোন একটি ভালো নির্বাচন করে দেশবাসীকে দেখাতে হবে তারা গণতন্ত্র উপহার দিয়েছে। এই উপহার তাদের কাছে কেউ চায়নি। বরং মি. কাদের যদি বলতেন, রংপুরে আওয়ামী লীগ হেরে গেছে, এবং কেন হেরেছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি -তাহলেও সেটা একটি সত্য এবং রাজনৈতিক বক্তব্য হতো।

রংপুর এক সময়ে এরশাদের জাতীয় পার্টি সমর্থিত এলাকা হিসেবে দাড়িয়েছিলো। তবে ২০০৮ এর নির্বাচনে ও তার পরের কয়েকটি উপ- নির্বাচনে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছিলো। রংপুর যে স্বৈরশাসক এরশাদের তথাকথিত মিথ থেকে বের হয়ে আসছিলো সেটাই প্রমাণ হচ্ছিলো।

অন্যদিকে আরো একটি সত্য আওয়ামী লীগসহ তার জোট ও দেশের অন্য বামপন্থী দলগুলোকে মনে রাখতে হবে, জাতীয় পার্টি বা বিএনপির বিজয়ের ভিতর কোন গণতন্ত্রের বিজয় নেই। দুটো দলই সামরিক স্বৈরশাসকের উত্তরাধিকার। তাই বাংলাদেশের নির্বাচনে তাদের বিজয় হওয়ার অর্থই হলো গণতন্ত্রের পরাজয়। অর্থাৎ মানুষ আবার ভুল ভোট দিয়েছে।

অনেকেই বড় বেশি ‘গণতন্ত্রী’ হতে গিয়ে বলে মানুষ ভুল ভোট দেয় না। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে এ কথা সত্য নয়। এই পূর্ববাংলার মানুষ ১৯৪৬ সালে ভুল ভোট দিয়েছিলো। পশ্চিম পাকিস্তানের কোন প্রদেশে পাকিস্তানের পক্ষকে মানুষ ভোটে বিজয়ী করেনি। একমাত্র পূর্ববাংলা পাকিস্তানের পক্ষকে বিজয়ী করেছিলো। আর ভুল ভোটের খেসারত অনেক বড়। ৪৬ এর খেসারত ১৯৭১ সালে ত্রিশ লক্ষ জীবন দিয়ে ও এক কোটি মানুষকে গৃহহীন হয়ে দিতে হয়। বিএনপি ও জাতীয় পাটি ক্ষমতায় এলেও কম খেসারত দিতে হয় না। হাওয়া ভবন থেকে শুরু করে অনেক কিছুই হয়। তাই জাতীয় পার্টির জেতার ভিতর গণতন্ত্রের কোন বিজয় দেখার সুযোগ নেই।

তাই জাতীয় পার্টি বিজয়ী হয়েছে এটা গণতন্ত্রের বিজয় বলে আওয়ামী লীগ মুখরক্ষার চেষ্টা করতে পারে, তবে সত্য লুকাতে পারে না তারা পরাজিত হয়েছে। রংপুর সিটি কর্পোরেশনে গত পাঁচ বছরে উন্নয়ন হয়নি একথা বললে মিথ্যে বলা হবে। তাহলে কেন সে উন্নয়ন কাজে লাগলো না ভোটে? আওয়ামী লীগ কি কোন পরিকল্পিত উন্নয়ন করতে পারেনি, না উন্নয়নের সুফল কি তা মানুষকে বোঝাতে পারেনি? কোনটা সত্য এখানে?

এরশাদ তার আমলে ওইভাবে রংপুরের উন্নয়ন করেননি, তবে শুধু রংপুরের ছেলে ( যদিও প্রকৃত অর্থে তিনি কুচবিহারের ছেলে) এই আবেগে রংপুরকে তার ঘাঁটিতে পরিণত করেছেন। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর সব নির্বাচনে নানান আবেগ কাজ করে। যেমন- আমেরিকার ওহাইও রাজ্যে এবার বিপুল সংখ্যক আফ্রিকান-আমেরিকান ভোট দিতে যায়নি। তারা সকলে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থক। অথচ এর আগের দুবার তাদের ভোট দেয়ায় উৎসাহ ছিলো বেশি। তার কারণ ছিলো, ওবামা আফ্রিকান আমেরিকান। এবার হিলারি হোয়াইট আমেরিকান- তাই তারা ভোট দেয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখেনি। রংপুর যেমন এরশাদের বাড়ি, তেমনি রংপুর শেখ হাসিনার শ্বশুরবাড়ি, সজীব ওয়াজেদ জয়ের বাড়ি- এই আবেগও গত নয় বছরে উন্নয়নকে কোনভাবেই আওয়ামী লীগ সাংগঠনিক কাজে লাগাতে পারেনি। অথচ কাজটা রংপুরে আওয়ামী লীগের জন্যে সহজ ছিলো। কারণ, ১৯৭৯ এ আওয়ামী লীগের দুর্দিনে রংপুর আওয়ামী লীগেরই ছিলো।

আওয়ামী লীগের এই ব্যর্থতা থেকে মোটা দাগে বলা যায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা রংপুরকে উদ্ধারের কোন চেষ্টা করেননি। বরং তারা গত নয় বছর ক্ষমতা উপভোগে হয়তো ব্যস্ত ছিলেন বেশি। অন্যদিকে কেন্দ্রিয় নেতৃত্ব সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছেন ওই এলাকায় সংগঠন ও আবেগের জোয়ার তুলতে। এমনকি তারা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন দেশ জুড়ে যে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা বেড়েছে সেটাকে রংপুরে ভোটে রূপান্তরিত করতে।

নেতা তার জনপ্রিয়তা বাড়ান নিজের কাজ দিয়ে, সততা দিয়ে, সাহস দিয়ে। নেতার এই জনপ্রিয়তাকে ভোটে রূপান্তরিত করতে হয় সংগঠনকে। এখন নেতার নাম শুনলে হাজার লোক ছুটে আসে আর সংগঠনের নেতারা গেলে যদি সাধারণ মানুষ ভয়ে পালায় তাহলে তো আর নেতার ওই সমর্থক কখনই ভোটে রূপান্তারিত হবে না। শেখ হাসিনার এই জনপ্রিয়তার ফসল আওয়ামী লীগ ঘরে তুলতে পারবে না।

বরং তাদের সহিংসতা তাদেরকে জনগণ থেকে আরো দূরে ঠেলে দিয়েছে। বিএনপির পাশাপাশি এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের জন্যেও কোন ভালো মেসেজ দেশবাসীর কাছে যাবে না। প্রথম খারাপ মেসেজ যাবে, আওয়ামী লীগের উন্নয়নকে আওয়ামী লীগ ভোটে রূপান্তরিত করতে পারেনি- অথচ উন্নয়নই আওয়ামী লীগের আগামী ভোটে মূল চাবিকাঠি। দ্বিতীয় খারাপ মেসেজ যাবে, আওয়ামী লীগের সিটিং প্রার্থী আগামী নির্বাচনের জন্যে সবক্ষেত্রে ভালো নয়। সর্বোপরি, এই নির্বাচন তাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে তরুণদের আওয়ামী লীগ তাদের ভোটে রূপান্তরিত করতে পারবে কীভাবে? এই তিনটি ক্ষেত্রেই আওয়ামী লীগ রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখানে কোন মতেই বলার অবকাশ নেই গণতন্ত্র জিতেছে। বরং সত্য স্বীকার করতে হবে আওয়ামী লীগ অসহায়ভাবে হেরেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *