নিউজ ডেস্ক, স্বদেশ নিউজ২৪, সম্পাদনায়-সাইমুর রহমান:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন নতুন কিছু নয়। তবে কিছু প্রত্যাবর্তন সময়ের সঙ্গে একটি বড় প্রশ্ন নিয়ে আসে। তারেক রহমানের সাম্প্রতিক দেশে ফেরা ঠিক তেমনই একটি ঘটনা, যেখানে ব্যক্তির উপস্থিতির পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে তার আচরণ, সিদ্ধান্ত ও প্রতীকী বার্তাগুলো।
দেশের মাটিতে পা রেখেই জুতা খুলে খালি পায়ে মাটি স্পর্শ করা একটি নীরব তাৎপর্যপূর্ণ দৃশ্য। এটি আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে আবেগী সংযোগের প্রকাশ। একইভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সহযোগিতার জন্য ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানানো রাজনীতিতে বিরল এক সৌজন্যের উদাহরণ। তার যাতায়াতের জন্য নির্বাচিত গাড়িটিও ছিল আলোচনার বিষয়। প্রথাগত বিলাসবহুল গাড়ির প্রটোকলের বদলে লোকাল বাসের আদলে একটি সাধারণ যান, সামনে “ সবার আগে বাংলাদেশ” লেখা সাইনবোর্ড। এই দৃশ্য অনেকের কাছে ক্ষমতার রাজনীতি থেকে জনসম্পৃক্ত রাজনীতির দিকে সরে আসার একটি ইঙ্গিত হিসেবে ধরা দিয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি আসে জনসমাগমের মুহূর্তে। বিপুল মানুষের উপস্থিতিতে গাড়ি নিয়ে স্টেজে পৌঁছানো সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠে তখন তিনি গাড়ি ছেড়ে জনগণ সমুদ্রের মাঝ দিয়ে হেঁটে স্টেজে ওঠেন। এটি ছিল একদিকে ঝুঁকিপূর্ণ সাহসী সিদ্ধান্ত, অন্যদিকে জননিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রকাশ।
স্টেজে উঠেও তিনি প্রচলিত প্রটোকল অনুসরণ করেননি। অলংকৃত আসন সরিয়ে সাধারণ চেয়ারে বসা, বক্তব্যের আগে ও পরে জনগণকে সরাসরি অভিবাদন জানানো এবং গবেষণানির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন করা তার রাজনৈতিক উপস্থাপনাকে আলাদা মাত্রা দেয়। যে বক্তব্যের প্রতিটি লাইন অর্থবহ ও চৌকস পূর্ণ।
বিদায় মুহূর্তে তিনি যে কথাটি বলেছেন, তা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ব্যক্তি ও পরিবার গুরুত্বপূর্ণ হলেও দেশ ও দেশের মানুষ তার চেয়েও বড়। অসুস্থ মায়ের জন্য দোয়া চেয়ে হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলে বক্তব্য শেষ করা ছিল আবেগী, কিন্তু সংযত।
ছোট ছোট আচরণও মানুষের দৃষ্টি এড়ায়নি। ব্যবহৃত টিস্যু মাটিতে না ফেলে বিশাস্ত নেতার কাছে দেওয়া এবং সেই টিস্যু পকেটে রাখা, সেলফি তুলতে আসা তরুণকে প্রশাসনিক বকুনি থেকে বিরত রাখা, কিংবা রাস্তায় একজন সাধারণ ছাত্রের সঙ্গে নিজ উদ্যোগে ছবি তোলা, ভিডিও করার সুযোগ করে দেওয়া এসব ঘটনাই তার রাজনৈতিক উপস্থিতিকে মানবিক রূপ দেয়।
পরবর্তী সময়ে পিতার কবর জিয়ারত, ওসমান হাদির কবর জিয়ারত, জুলাই–আগস্টে আহতদের সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ এবং ভাইয়ের কবর জিয়ারত ছিল ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্মৃতির সংযোগ। পাশাপাশি একজন সাধারণ নাগরিকের মতো ভোটার তালিকায় নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করাও একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করে।
এই সব মিলিয়ে তারেক রহমানকে অনেকেই নতুনভাবে মূল্যায়ন করছেন। তার সমর্থকদের কাছে তিনি আশার প্রতীক হয়ে উঠছেন। তবে এখানেই থামার সুযোগ নেই।
কারণ গণতন্ত্র ব্যক্তির জনপ্রিয়তায় নয়, ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতায় দাঁড়িয়ে থাকে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, অতীতের কারচুপি অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে কি না, রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর ভূমিকা কতটা দায়িত্বশীল হবে! এই প্রশ্নগুলো এখনো উত্তরহীন।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক আলোচনাকে নতুন গতি দিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস লিখবে একটি প্রশ্নের উত্তরই: এই প্রত্যাবর্তন কি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে, নাকি কেবল আরেকটি আবেগী অধ্যায় হয়ে থাকবে। নেতা ফিরেছেন, নির্বাচন হবে কিন্তু এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন ও দায়িত্বরত প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা প্রস্তুত।
লেখক: রানা বর্তমান
(সাহিত্যিক লেখক নাট্যনির্মাতা ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব)
