নিজেদের দলীয় লোকদের কারণে হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক জালিয়াতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করে আবারো আলোচনায় এসেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে বাজেট পাসের আগে ব্যাংক ও আর্থিত খাতের মঞ্জুরি বরাদ্দের ওপর আনীত ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেন, নিজেদের লোকের সমর্থনের কারণে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাচ্ছে না। জড়িতদের বেশ কয়েকজনকে জেলে নেয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে। কিন্তু যে গতিতে যাওয়া উচিত, সেই গতিতে যেতে পারছি না। অবশ্য এর সাথে সাথে মন্ত্রী হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, ব্যাংক জালিয়াতির সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।
এর আগে বিভিন্ন সময় দলীয়, স্বতন্ত্র ও বিরোধীদলীয় সদস্যদের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে বিভিন্ন বেফাঁস মন্তব্য করে আলোচনায় আসেন অর্থমন্ত্রী। সংসদে হলমার্কের অর্থ কেলেঙ্কারির ব্যাপারে ‘সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা কিছুই না’ মন্তব্য করে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তিনি।
এ ছাড়া সংসদে বিভিন্ন সময় সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তিনি ‘রাবিশ’, ‘বোগাস’ এ ধরনের শব্দ উচ্চারণ করেন। অর্থমন্ত্রীর উচ্চারিত এসব শব্দ ও ভাষা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ সর্বত্র বেশ আলোচিত-সমালোচিত।
ব্যাংক কেলেঙ্কারির বিষয়ে মঙ্গলবার সংসদে অর্থমন্ত্রীর দেয়া সর্বশেষ বক্তব্য গতকাল সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। সরকারদলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্যকে তার এ মন্তব্যকে ‘বেফাঁস’ আখ্যায়িত করতে শোনা গেছে। এ ছাড়া মন্ত্রীর এ বক্তব্য অনেকটা সত্য হলেও দলের জন্য বিব্রতকর বলেও দলীয় নেতাকর্মীদের বলতে শোনা যাচ্ছে।
সংসদে মঙ্গলবার ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট পাসের আগে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য মঞ্জুরি বরাদ্দের ওপর আটজন সংসদ সদস্য ছাঁটাই প্রস্তাব দেন। ছাঁটাই প্রস্তাবে জাতীয় পার্টি ও স্বতন্ত্র আটজন সংসদ সদস্য বিভিন্ন ব্যাংকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘটনায় যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়ার অভিযোগ করেন।
স্বতন্ত্র সদস্য রুস্তম আলী ফরাজী বলেন, ব্যাংকের নাম শুনলে মানুষ আজ আঁতকে ওঠে। কয়েকটি ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে গেছে। ৫৫ হাজার কোটি টাকা ঋণখেলাপি। এ অবস্থা চলতে পারে না। কারা সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার করেছে তাদের নাম প্রকাশ করুন। হাজী সেলিম বলেন, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, কিন্তু কোনো বিচার হয়নি। নুরুল ইসলাম মিলন বলেন, ব্যাংকের টাকা লুটপাটের কোনো হিসাব নেই। খেলাপি ঋণ উদ্ধারের কোনো ব্যবস্থা নেই। ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
জবাব দিতে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রী সোনালী ব্যাংকের হলমার্ক কেলেঙ্কারির বিষয়ে বলেন, সোনালী ব্যাংকের মামলায় একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) জেলে নেয়া হয়েছে। তিনি জেলেই মারা গেছেন। আরেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে জেলে নেয়া হয়েছে। আরেকজনকে কোনোভাবেই জেলে নেয়া যাচ্ছে না। এরা সবাই বিভিন্ন জালিয়াতির মামলার আসামি। কিন্তু তারা আমাদের লোকজনের সমর্থনে রয়েছেন। নিয়ে আমি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ।
বেসিক ব্যাংক প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাংকের নতুন পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। তারা অনুসন্ধান চালিয়ে রিপোর্ট ঠিক করছেন। রিপোর্টটি হাতে পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এরই মধ্যে কিছু ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, যাতে বেসিক ব্যাংকের সাথে সংশ্লিষ্ট দুষ্ট লোকেরা দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে। সোনালী ও বেসিক ব্যাংকের কেলেঙ্কারির কারণে ব্যাংক খাতে কিছুটা আস্থার সঙ্কট হয়েছে স্বীকার করে অর্থমন্ত্রী বলেন, অবশ্যই ব্যাংকের কাজকর্মে আস্থা ও বিশ্বাস প্রয়োজন। যখনই সেটিতে ঘাটতি হয়, তখনই মনে প্রশ্ন জাগে। আমাদের কিছু কিছু ঘাটতি হয়েছে সোনালী ও বেসিক ব্যাংকে। সে জন্য কিছু কিছু পদক্ষেপও নেয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রী বলেন, ব্যাংক জালিয়াতির সাথে জড়িতরা কেউ কোনোভাবেই ছাড় পাবে না। জালিয়াতির সাথে জড়িতদের আগে কেউ স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি। কিন্তু আমরা ছাড় দেইনি। মামলা করেছি, জড়িতদের জেলে নিয়েছি, বিচারের মুখোমুখি করেছি। এরা কেউ ছাড় পাবে না।
এর আগে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় খাতে ছাঁটাই প্রস্তাবের জবাব দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী কিছুটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, যেসব উপদেশ দেয়া হয়েছে সেগুলো অদ্ভুত উপদেশ। সংসদ সদস্যরা ভুল পরামর্শ দিয়েছেন। তাই এ মন্ত্রণালয়ের টাকা কমাতে পারছি না। এর আগেও সংসদে ব্যাংক কেলেঙ্কারি নিয়ে অর্থমন্ত্রী দলীয় কিছু সংসদ সদস্যের সমালোচনার মুখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বক্তব্য দেন, যেগুলো নিয়ে পরে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।
