আবারো রাজধানীর বুকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো ওয়াশিকুর রহমান নামের এক ব্লগারকে। জানা গেছে, অভিজিৎ রায় হত্যার এক প্রতিবাদী কন্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হতো তার কন্ঠে। এই প্রতিবাদ তিনি তুলে ধরতেন কখনো বা ‘কু”িছত হাঁসের ছানা’ অথবা ‘গ-মুর্খ’ নামের ফেববুক পেজে। অবশ্য ব্লগে তিনি ওয়াশিকুর বাবু নামেই পরিচিত ছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক থেকে এমন বেশ কিছু তথ্য জানা গেছে। এসব সাইট অনুসন্ধান করে দেখা যায়, অভিজিৎ হত্যার প্রতিবাদে যে ক’জন মুক্তমনা ব্লগার তাদের লেখনির মাধ্যমে প্রতিবাদ জানিয়ে ছিলেন, ওয়াশিকুর রহমান তাদের মধ্যে অন্যতম। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সময় সমাজের নানা অসঙ্গতির কথাও তার ব্লগে তুলে ধরতেন।
তবে ব্লগারদের হত্যার পেছনে যে গোষ্ঠী কাজ করছেন তাদের হিট লিস্টে এই তরুণ ব্লগারের নাম ছিল কিনা তা এখনো জানা যায়নি। ধারণা করা হয়, ‘আনসার উল্লাহ বাংলা টিম-২’ এই ধরণের হত্যাকা-ের পেছনে জড়িত রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও বার বার এদের কথা বলা হয়েছে।
সোমবার সকালে বেগুনবাড়ী জিপিকা ঢাল এলাকা থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত ওয়াশিকুর ফারইস্ট অ্যাভিয়েশন ট্রাভেল এজেন্সির আইটি বিভাগে কাজ করতেন। হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে ইতিমধ্যেই দু’জনকে আটক করেছে পুলিশ।
আটককৃতরা হলেন- জিকির (১৯) ও আরিফ (২০)। এরা মাদরাসা ছাত্র বলে জানা গেছে।
ফারইস্ট অ্যাভিয়েশন ট্রাভেল এজেন্সির মালিক কুতুব উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিশুক তার প্রতিষ্ঠানে আইটি বিভাগে কাজ করতো। সকাল সাড়ে ৯টায় অফিসে এসে বিকেল ৫টায় চলে যেতো। ব্যক্তিগতভাবে তিনি আর কিছু জানেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর বাইরে আর কোন তথ্য তার ব্যাপারে তিনি জানেন না।
এই হত্যাকা- বিষয়ে তেজগাঁ জোনের ডিসি বিপ্লব বিশ্বাস বলেন, আটককৃতদের দেয়া তথ্য অনুয়ায়ী এই হত্যাকা- পূর্ব পরিকল্পীত ভাবেই ঘটানো হয়েছে। আর তাকে মারার উদ্দেশ্যেই আটক দু’জন ঢাকায় এসেছে। আর আজ সকালে সুযোগ পেয়ে তারা ওয়াশিকুরকে খুন করে।
এদিকে আসক এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ব্লগারদের নিরাপত্তায় আগাম ব্যবস্থা নিতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সব ব্লগার এবং প্রগতিশীল ব্যক্তির নিরাপত্তায় সরকারের তরফ থেকে আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। অভিজিৎ রায় হত্যার অল্প কয়েক দিন পরই আরেকজন ব্লগারের হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে যে সরকারের পক্ষ থেকে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের নিরাপত্তায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সোমবার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামালের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে ব্লগার অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যার রেশ কাটতে না কাটতেই ওয়াশিকুর রহমান নামের আরেকজন ব্লগারের হত্যাকাণ্ডে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কারা জড়িত, তাদের উদ্দেশ্য কী, তার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার স্থানীয় লোকজন জানায়, সকাল আনুমানিক সাড়ে ৯টার সময় তিন যুবক ওয়াশিকুরকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে রক্তাক্ত করে। এসময় এক নারী ঘটনাটি দেখে ডাক-চিৎকার করে। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়ে তিন যুবককে ধাওয়া দেয়। তারা ঘটনাস্থলে চাপাতি ফেলে পালানোর চেষ্টা করলে রাস্তার মুখে অবস্থানরত তেজগাঁও থানা পুলিশ আরিফুল্লাহ আরিফ ও যিকরুললা যিকিরকে ধরে ফেলে। অন্য আরেকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব সরকার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ধর্মাত্তক বিরোধের জের ধরে ওয়াশিকুর রহমান বাবুকে তারা কুপিয়ে হত্যা করেছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত দুই যুবক স্বিকারোক্তি দিয়েছে। গত দুই তিন ধরে তারা বাবুর বাসা খোজাখুজি করে ঠিকানা নিশ্চিত হয়। এরপর আজ সকাল থেকে তিন যুবক মিলে তেজগাঁও বেগুন বড়ি মোড়ে ওৎ পেতে থাকে বাবুকে হত্যা করার জন্য। বাবু বাসা থেকে বের হয়ে মোড়ের দিকে আসতে থাকলে তিনজন মিলে তাকে এলোপাথারি কুপিয়ে হত্যা করে। আটককৃত দুই যুবক পুলিশকে জানিয়েছে তারা বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করে হাটহাজারী মাদ্রাসায় বসে। এদের মধ্যে একজন হাটহাজারী মাদ্রাসা ও অপরজন মিরপুর দারুল উলুম মাদ্রসায় পড়ালেখার কথা জানিয়েছে। তাদের দেয়া তথ্যমতে, তাহের নামে অপর আসামীকে ধরতে পুলিশ তৎপর চালাচ্ছে।
এদিকে নোয়াখালীল রামগঞ্জে ব্লগার ওয়াশিকুরের গ্রামের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। ওয়াশিকুরের মৃত্যুর খবর উপজেলাব্যপাী ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে তার বাড়িতে আত্মীয় স্বজন ও এলাকাবাসীর কান্নায় আকাশ-বাতাস ভারি হয়ে উঠছে।
নিহতের বাবা ছেলের মুত্যু সংবাদ শোনার পর থেকে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে আছেন। একমাত্র বোন আসরাফী সুলতানা সিমু কান্নাজড়িত কণ্ঠে সাংবাদিকদের জানান, বিশ বছর আগে আমরা মা হারাই, বাবা আমাদের ভাই-বোন দু’জনকে কোলেপিঠে অনেক কষ্টে মানুষ করেন।
ছোট বেলা থেকে সে খুব মেধাবী ও শান্ত স্বভাবের ছিল। সে কোন রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িত ছিল না, শুনেছি ব্লগে একটু লেখালেখি করত, এ জন্য জামাত-শিবির অথবা জঙ্গি সংগঠনের কেউ এ হত্যা করতে পারে। এ ছাড়া আমার ভাইয়ের কোন শত্রু ছিল না।
এলাকাবাসী জানান, ওয়াশিকুর রহমান ২০০৪ইং সালে উপজেলার চণ্ডিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, তেজগাঁও কলেজ থেকে এইচ এস সি , জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স পাশ করে ঢাকাস্থ মতিঝিল ফারইস্ট ট্রাভেলস এ্যভিয়েশনে কর্মরত ছিলেন। তার আচরণ খুব ভাল ছিল, তার সাথে কখনও কারো মতানৈক্য হয়নি। এ রকম ছেলেকে মেরে ফেলা মেনে নেয়া কষ্টকর।
–