Breaking
Thu. Jul 16th, 2026

ওয়াশিকুরের খুনিদের জাপটে ধরলেন কয়েক হিজড়া

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবুর খুনিরা পালিয়ে যাওয়ার সময় কয়েক হিজড়া তাদের জাপটে ধরেন। এরপর স্থানীয়রা এগিয়ে আসেন। তারপর তাদের পুলিশে দেয়া হয়।

সোমবার সকালে নিজ বাসার সামনে খুন হন ওয়াশিকুর। খুনিরা তাকে খুন করে পালানোর সময় কয়েক হিজড়া তাদের জাপটে ধরে। স্থানীয়রা এমন তথ্য জানিয়েছেন।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বারেক জানান, তিন হামলাকারী পালানোর সময় কয়েকজন হিজড়া দুইজনকে জাপটে ধরে। পিছন থেকে স্থানীয় বাসিন্দারা এগিয়ে গিয়ে দুইজনকে আটক করে। এই দুজন হলেন; যিকিরুল্লাহ যিকির ও আরিফুল্লাহ আরিফ। পরে তাদের পুলিশে হস্তান্তর করে স্থানীয়রা।

অফিসে যাওয়ার সময় রাস্তার যে অংশে তার ওপর হামলা হয়, তার এক পাশে টেক্সটাইল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকার প্রাচীর। অন্যপাশে আরেকটি ভবন। সরু সড়কটির যেখানে ঘটনাটি ঘটেছে সেখানে কোনো দোকান নেই। ঘটনার সময় ওই রাস্তায় লোকজনও ছিল কম। কয়েকগজ দূরে একটি ফার্মেসি থাকলেও তিনি ঘটনার সময় দোকান বন্ধ করে চলে যান। খোকন জেনারেল স্টোরের সামনে জিয়াউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি জানান, সকালে হঠাৎ নারীকণ্ঠে চিৎকার শুনতে পান তিনি। এরপর কয়েকজন ‘কাস্টমার’ ও তিনি রাস্তায় এসে দেখতে পান রক্তাক্ত অবস্থায় একজন পড়ে আছেন। তা দেখে এক নারী চিৎকার করছেন। আর তিন যুবক দৌঁড়ে মূল রাস্তার দিকে পালাচ্ছেন।

আটকৃতদের পরনে লাল রঙয়ের পোশাক

আটকৃত যিকিরউল্লাহ ও আরিফুল্লাহ দুজনেই মাদরাসা ছাত্র। চট্রগ্রামের হাটহাজারি মাদরাসার ছাত্র জিকরুল্লাহ ও রাজধানীর মিরপুরের দারুল উলুম মাদরাসার ছাত্র আরিফুল ইসলাম। এদের মধ্যে যিকিরউল্লাহ ওয়াশিকুরকে হত্যার উদ্দেশ্যে গতকাল ঢাকায় আসেন বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। তারা দুজনেই হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। মাসুদ নামে তাদের এক কথিত বড়ভাইয়ের আদেশেই ওয়াশিকুরকে হত্যা করা হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।

মাদরাসার ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও জিন্সের প্যান্ট ও লালগেঞ্জি পরনের কারণ হিসেবে তারা জানিয়েছেন, সব বড়ভাইয়ের নির্দেশে করা হয়েছে। যাতে তাদের গায়ে রক্তের দাগ না থাকে এজন্য তারা লাল রঙের গেঞ্জি পরেছেন।

‘আসুন নাস্তিকদের কটূক্তির বিরুদ্ধে দাঁতভাঙা জবাব‬ দেই’

রাজধানীর বেগুনবাড়িতে খুন হওয়া অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ওয়াশিকুর রহমান বাবু ব্লগে লেখার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেই বেশি লিখতেন। ‘আসুন নাস্তিকদের কটূক্তির বিরুদ্ধে দাঁতভাঙা জবাব‬ দেই’ শিরোনামে তিনি ১০৩ টি পর্ব (স্টাটাস) লিখেছেন। এই লেখায় উগ্রবাদীরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে হত্যা করতে পারে বলে জানিয়েছেন অন্য অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তামান্না সেতু বলেন, ‘ওয়াশিকুর নাস্তিক ছিলো না। সে ব্লগেও এমন কিছু লিখতেন না যা কোনো সম্প্রদায়কে আঘাত করে। তারপরও তাকে হত্যা করা হলো। ছেলেটার মা নেই। ঢাকায় বাবার সঙ্গেই থাকতো। তাকে এভাবে খুন করা হলো।‘

তিনি আরো বলেন, ‘ওয়াশিকুর আমার কাছে কি যেনো বলতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাকে আমি ফেসবুকে ও ফোনে বলতে নিষেধ করেছি। দেখা হলে বলতে বলেছিলাম। সে কি বলতে চেয়েছিলো তাও জানা হলো না।’

ফেসবুক ও অন্যান্য কিছু বাংলা ব্লগসাইটে দেখা গেছে, ওয়াশিকুর রহমানের লেখালেখির অন্যতম একটি বিষয় ছিল ইসলামসহ নানা ধর্মের সমালোচনামূলক প্রসঙ্গ। তার বিভিন্ন মন্তব্য নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অন্য আরো অনেকের মধ্যে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হতো।

ফেসবুকে ওয়াশিকুর রহমানের প্রোফাইলে নাম ছিল ‘ওয়াশিকুর বাবু’। এ ছাড়া কয়েকটি ব্লগ সাইটে তিনি ‘কুচ্ছিত হাঁসের ছানা’, ‘গন্ডমুর্খ’, ‘বোকা মানব’ ইত্যাদি একাধিক নামে লিখতেন বলে জানা যাচ্ছে।

মুক্তচিন্তা, সাম্প্রদায়িকতা, বিজ্ঞান, ধর্মীয় কুসংস্কার বা গোঁড়ামি – ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রায়ই লেখালিখি এবং তীক্ষ্ম মন্তব্য করতেন ওয়াশিকুর রহমান।

এর আগে যে দুজন ব্লগার ধর্মীয় বিষয় নিয়ে লেখালিখির কারণে ধারালো অস্ত্রধারীদের আক্রমণে নিহত হন – সেই রাজীব হায়দার বা ‘থাবা বাবা’ এবং গতমাসে নিহত ব্লগার-লেখক অভিজিৎ রায় এই দু’জনের মৃত্যুর পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ফেসবুকে একাধিকবার মন্তব্য করেন ওয়াশিকুর।

তার সেই মন্তব্যগুলোর জবাবে আবার ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়াও আসে ফেসবুকে অন্য কিছু ব্যবহারকারীর দিক থেকে। ফেসবুকে ওয়াশিকুরের সবশেষ প্রোফাইল ছবিটিই ছিল ‘আই অ্যাম অভিজিৎ’ লেখা একটি পোস্টার। তাতে ইংরেজিতে আরো লেখা আছে ‘শব্দের মৃত্যু নেই’ ।

তিনি ‘এথিস্ট (নাস্তিক) বাংলাদেশ’ এবং ‘বাংলার শার্লি’ (ফরাসি ম্যাগাজিন শার্লি এবদু) সহ বেশ কয়েকটি ফেসবুক গ্রুপের সদস্য ছিলেন।

এ ছাড়া ‘লজিক্যাল ফোরাম’ নামের একটি অনলাইন ডিসকাশন ফোরামেরও সদস্য ছিলেন ওয়াশিকুর।

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *