Select your Top Menu from wp menus
শুক্রবার, ১৯শে জানুয়ারি ২০১৮ ইং ।। রাত ১:৪৩

দাঁত মাজার মতোই জরুরি নিয়মিত ফ্লসিং: ডা. জিনিয়া

আরজে রাফি, নিউজ ডেস্কঃ স্কুল-কলেজে গণিত পরীক্ষার আগে সবসময় দুই-তিন দিনের একটা লম্বা ছুটি থাকত। কারণ গণিত হলো ভীতির নাম! টানা দুই-তিন দিন ধরে গণিত অনুশীলন করে পরীক্ষার হলে গেলেও, প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়া মাত্রই মনে হতে শুরু করে, সব সূত্র হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে যেন। জিনিয়া’র অবশ্য এই সকল সমস্যা একেবারেই ছিল না। দুই-তিন দিনের লম্বা ছুটি পার করে গণিত পরীক্ষার ঠিক আগের দিন সন্ধ্যা নাগাদ ফুরফুরে মেজাজে গণিত বই নিয়ে বসা হতো তার। কয়েক ঘন্টার টানা অনুশীলনই যথেষ্ট ছিল তার জন্য।

ফলাফল বের হলে বরাবরই দেখা যেত গণিতে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে বসে আছেন তিনি। প্রথম সারির ছাত্রী, গণিতে দূর্দান্ত পারদর্শিতা এবং গণিতের প্রতি ভালোবাসার জন্যেই সেই ছেলেবেলা থেকেই জিনিয়া চাইতেন একজন ইঞ্জিনিয়ার হবার। স্বপ্ন দেখতেন বুয়েটে পড়ার। কিন্তু ভবিষ্যৎ সময় তার জন্য পরিকল্পনা করে রেখেছিল একেবারেই ভিন্ন কিছু। বাবা ডা. এম এ কাইয়ুম এবং মা মাহমুদা কাইয়ুম এর বড় সন্তান জিনিয়া মাহমুদা কাইয়ুম বর্তমানে একজন দন্ত চিকিৎসক। প্রশ্ন জাগতেই পারে, গণিত ও পদার্থ বিজ্ঞান ভালোবাসতেন যিনি তিনি কীভাবে একজন দন্ত চিকিৎসক হয়ে গেলেন? সেই গল্পটাই জানিয়েছেন তিনি!

২০০৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর থেকেই তিনি চেষ্টা করেছিলেন বুয়েটে ভর্তির জন্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বুয়েটে ভর্তি হবার সুযোগ পাননি। এরপর সরকারি বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েও কৃতকার্য হতে না পারায় মানসিকভাবে খুব ভেঙ্গে পড়েছিলেন তিনি।

বুয়েট তার কাছে ছিল স্বপ্নের মতো। সেখানে অকৃতকার্য হওয়ার কষ্ট তো রয়েছেই, সাথে আছে অন্যান্য সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার দিয়েও ভালো ফলাফল করতে না পারার বোঝা। সকল কিছু মিলিয়ে মনঃকষ্ট নিয়েও নিজেকে পরবর্তি বছরের ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন তিনি। বুয়েটের আশা বাদ পড়লেও ইঞ্জিনিয়ার তিনি ঠিকই হবেন। কিন্তু বিধিবাম। এতো প্রস্তুতি, এতো পরিশ্রম করা সত্ত্বেও সরকারি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সুযোগ পেলেন না পরের বছরেও।

তিনি হতাশ হয়ে পড়লেও তার বাবা একেবারেই হাল ছেড়ে দেননি। নিজে একজন দন্ত চিকিৎসক হওয়া চাইতেন মেয়েকেও দন্ত চিকিৎসক বানাবেন। কিন্তু মেয়ের আগ্রহের জায়গা ভিন্ন হওয়ায় কখনোই সেভাবে জোর করেননি। পরপর দু বছর ভর্তি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল না করতে পারায় একদিন সকালে কথাবার্তা বলে মোটামুটি নিমরাজী করিয়ে মেয়েকে তিনি ভর্তি করিয়ে দিলেন ‘মার্কস ডেন্টাল কলেজে’-এ।

২০১১ সাল থেকে ডেন্টাল কলেজে পড়ালেখার যাত্রা শুরু হয় জিনিয়া’র। স্কুল-কলেজ জীবনে যিনি জীববিজ্ঞান সাবজেক্টটি সবচাইতে অপছন্দ করতেন, তাকে সেই বিষয় নিয়েই পড়ালেখা করতে হচ্ছে! এই ব্যাপারটি কোনমতেই মানতে পারছিলেন না। যার প্রভাব পড়ছিল তার পড়ালেখা ও ফলাফলের উপরে। “স্কুল-কলেজ জীবনের প্রথম সারির ছাত্রী জিনিয়া ডেন্টিস্ট্রি পড়তে এসে হয়ে গেলেন ফেলটুস ছাত্রী।” এই কথা বলে হেসে দিয়েছিলেন তিনি। নিজের ক্লাসে সকল শিক্ষকদের কাছে রোল নাম্বার-৮ আলাদাভাবে মার্ক করা হয়ে গিয়েছিল। কারণ, আরো কয়েকটি রোল নাম্বারের পাশাপাশি ৮ নাম্বার রোল নাম্বারধারী একজন ফেলটুস ছাত্রী। এই ছাত্রী জিনিয়া বাদে অবশ্যই আর কেউ নন।

প্রথম ছয় মাস মনের ও ইচ্ছার বিপরীতে গিয়ে পড়ালেখা করার ব্যাপারটি সামলাতে কষ্ট হলেও এরপর থেকে খারাপ লাগা ভাবটি কমে যেতে শুরু করে অনেকটাই। নিজেই সিদ্ধান্ত নিলে, সারাজীবন ভালো ছাত্রী তকমা পেয়ে আসা জিনিয়া আর ফেলটুস ছাত্রী থাকবেন না। যেমন ভাবা তেমন পড়ালেখা! শুরু হলো পুরোদমে ডেন্টিস্ট্রি পড়া। নিজেকেই নিজে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আর একবারের জন্যেও পরীক্ষায় ফেল করা যাবে না। ডাক্তারি কিংবা ডেন্টিস্ট্রি- দুটো ক্ষেত্রে প্রতিটি প্রফে পাশ করে এগিয়ে যাওয়া বড়সড় একটা চ্যালেঞ্জ। সেটা যারা এই ক্ষেত্রে পড়ালেখা করছেন, করেছেন এবং পরিচিত কাউকে দেখেছেন এই বিষয়ে পড়তে তারা ভালো জানেন।

আনন্দের বিষয় হচ্ছে, সেদিনের পর থেকে জিনিয়াকে কখনোই থেমে থাকতে হয়নি। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম তো ছিলই সাথে ছিল তার বাবা-মায়ের অবদান। বাবা-মায়ের প্রসঙ্গে জিনিয়া বলেন, “আমার আজকের ডেন্টিস হয়ে ওঠার পেছনে সবটুকু অবদান আমার বাবা-মায়ের। তারা আমার পাশে সবসময় না থাকলে আর আমাকে সাপোর্ট না দিলে কখনোই আজকের দিনে এসে দাঁড়ানো সম্ভব হতো না।”

অবশেষে ২০১৬ সালের ১৬ জানুয়ারি তার ফাইনাল প্রফের ফলাফল প্রকাশ হয়। নিজের ফলাফল না দেখে শুধুমাত্র ফলাফল প্রকাশ হয়েছে শুনেই আশঙ্কা ও আতঙ্কে কেঁদে দিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ডেন্টাল কলেজে গিয়ে নিজের ফলাফল স্বচক্ষে দেখার পরে বিশ্বাস করেছিলেন যে, তার নামের আগে এখন থেকে ডাক্তার শব্দটি পাকাপাকিভাবেই বসে গিয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছেন ডা. জিনিয়া মাহমুদা কাইয়ুম।

তীব্র অপছন্দের বিষয়টি বর্তমানে তার জীবনে তীব্র প্যাশন ও ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে। নিয়মিত কাজ করছেন বাবার চেম্বার ‘মতিন ডেন্টাল কেয়ার’ এ। ইতিমধ্যে বেশ সুনাম কুড়িয়েছেন নিজের দক্ষতা ও কাজ দিয়ে। তিনি জানান, ডেন্টিস্ট্রির পুরো ব্যাপারটিই হলো ধৈর্য্যের। সময়সাপেক্ষ এই কাজটি যত্ন নিয়ে করতে হয় খুব। যখন কোন রোগী তার সেবার প্রশংসা করেন এবং পুনরায় তার কাছে দাঁতের সমস্যা নিয়ে দেখা করতে আসেন, তখন খুবই পুলকিত হন জিনিয়া। বাবা’র স্বপ্ন, নিজের প্যাশন সবকিছু মিলেমিশে আরো সামনে এগিয়ে যেতে চান তিনি। ভবিষ্যতে উচ্চতর ডিগ্রী নেবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন এখন থেকেই।

নিজের জীবন ও ক্যারিয়ারের গল্পের পাশাপাশি ছোটখাটো কিছু টিপসও শেয়ার করেছেন তিনি দাঁতের যত্ন নিয়ে। যা দাঁতকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করবে বলে জানান তিনি।

কোমল পানীয়

১/ ক্যালসিয়াম যুক্ত খাদ্য গ্রহণ করতে হবে প্রতিদিন। সুস্থ দাঁতের জন্য এবং দাঁতকে সুরক্ষিত রাখার জন্য সবচাইতে বেশী প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান হলো ক্যালসিয়াম। দুধ এবং দুগ্ধজাতীয় খাদ্য উপাদান থেকে শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম পাওয়া সম্ভব। প্রতিদিন দুধ পান করা যে জন্য প্রয়োজনীয়।

২/ কোমল পানীয় পান করতে সবাই পছন্দ করলেও এটা দাঁতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর পানীয়। এই সকল পানীয়তে থাকে উচ্চমাত্রায় ফসফরাস। যা দাঁতে দীর্ঘস্থায়ি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে দেয় কোমল পানীয়। বিশেষ করে, দাঁতের এনামেল ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে থাকে অতিরিক্ত কোমল পানীয় পানের ফলে।

৩/ নিয়মিত দুই বেলা দাঁত মাজলেও অনেকেই ফ্লসিং এর ব্যাপারে জানেন না এবং করেন না। দাঁত মাজার মতোই জরুরি ফ্লসিং করা। দাঁতের সঠিক পরিচর্যার ক্ষেত্রে নিয়মিত ফ্লসিং এর কোন বিকল্প নেই। কারণ ব্রাশের সাহায্যে দাঁত মাজার পরেও দুই দাঁতের মাঝে কিছু খাদ্যকণা রয়ে যায়। যা শুধু ফ্লসিং এর সাহায্যেই পুরোপুরি দূর করা সম্ভব।

৪/ ভালো কোন টাং ক্লিনার দিয়ে প্রতিদিন জিহ্বা পরিষ্কার করতে হবে। এতে করে জিহ্বাতে বসবাস করা অসংখ্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দূর করা সম্ভব। এই সকল ব্যাকটেরিয়া মুখে দূর্গন্ধ তৈরি করে এবং দাঁতের ক্ষতি করে থাকে।

৬/ মুখ ও দাঁতের সম্পূর্ণ সুরক্ষার জন্য লিস্টারিন মাউথওয়াশ সবচাইতে কার্যকরি। মাউথওয়াশে থাকা ক্লোরিন ডাইঅক্সাইড মুখের ভেতরের খারাপ ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে এবং ভালো ব্যাকটেরিয়ার সমতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। এতে করে দাঁত শক্ত ও সুস্থ থাকে। মাউথওয়াশ খুব ঘনঘন ব্যবহার না করলেও, ভারী খাওয়া-দাওয়ার পর ব্যবহার করা উচিৎ।

৫/ প্রতি বছর অন্ততপক্ষে দুইবার দন্ত চিকিৎসক এর সাহায্যে দাঁতের চেকআপ করাতে হবে। সকলের মাঝে প্রবণতা থাকে, দাঁতের গুরুতর সমস্যা দেখা না দেওয়া পর্যন্ত দাঁতের ডাক্তারের কাছে না যাওয়া। যার ফলে দাঁতের সমস্যা নিয়ে বেশী কষ্ট ভোগ করতে হয়। নিয়মিত দন্ত চিকিৎসক এর কাছে দাঁত দেখালে এমন সমস্যা দেখা দেবে না।

About The Author

Related posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *