শিরোনাম

সেকালের ঈদ

| ০৬ জুন ২০১৯ | ১১:৫৬ অপরাহ্ণ

সেকালের ঈদ

সম্পাদনায়-আরজে সাইমুর রহমান: বাংলার গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখলে ঈদের ‘সেকাল’ প্রাচীন নয়, প্রায় অর্বাচীন। তবে ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে তা তো প্রাচীন বটেই। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার মতো ব্যাপারও বটে। পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান ঐতিহাসিক কারণেই খুব বেশি আগে থেকে সামাজিকভাবে সংহত, সচেতন এবং শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থবিত্তে সম্পন্ন হতে পারেনি। আর এই উপাদানগুলো ছাড়াও উপাদান হিসেবে সামাজিক-আত্মপরিচয়মুক্ত না হলে কোনো সমাজ উৎসব উদ্​যাপনে সক্ষমতা অর্জন করে না। অন্যদিকে উৎসবটি সম্পন্ন হয় ধর্মীয়ভাবে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সমাজের ধর্ম-সামাজিক সত্তার জাগরণীও আবশ্যক। পূর্ব বাংলা, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়েছে ১৯৩০-এর দশকের প্রজন্ম থেকে। ১৯৩৭ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে, বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকায় এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ঔদার্যে বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে নতুন শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের উদ্ভব ঘটে, তাদের হাতেই বাঙালি মুসলমানের ধর্ম-সামাজিক আনন্দ-উৎসব হিসেবে সাংস্কৃতিকভাবে তাৎপযপূর্ণ ঈদ উৎসবের সূচনা। নব্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ঈদ উৎসবকে সর্বজনীনতা জ্ঞান করে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এবং আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে রেকর্ড করা গান: ‘ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’। ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে বাংলার ঈদ উৎসব ধীরে ধীরে ধর্ম-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে বৃহৎ থেকে বিশাল আবর্তনে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে বাংলার আধুনিক ঈদ উৎসবের ‘সেকাল’ সত্তর-আশি বছরও এখন পর্যন্ত অতিক্রম করেনি।

বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের নতুন ধারার এই ঈদ উৎসবের উদাহরণ হিসেবে আমরা পারোনো ঢাকা জেলার কালীগঞ্জ থানার অধিবাসী পুলিশ কর্মকর্তা খন্দকার আবু তালেবের আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে একটা অংশ উদ্ধৃত করছি:

এখনকার মতো সেই পািকস্তান আমলেও ঈদের দিন ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন নারীরা। তবে সে সময় তাঁদের বাহন ছিল পর্দাঘেরা রিকশা। ছবি: সংগৃহীতএখনকার মতো সেই পািকস্তান আমলেও ঈদের দিন ঢাকার রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন নারীরা। তবে সে সময় তাঁদের বাহন ছিল পর্দাঘেরা রিকশা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলার গ্রামাঞ্চলে ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দেখলে ঈদের ‘সেকাল’ প্রাচীন নয়, প্রায় অর্বাচীন। তবে ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে তা তো প্রাচীন বটেই। ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার মতো ব্যাপারও বটে। পূর্ব বাংলার বাঙালি মুসলমান ঐতিহাসিক কারণেই খুব বেশি আগে থেকে সামাজিকভাবে সংহত, সচেতন এবং শিক্ষাদীক্ষা ও অর্থবিত্তে সম্পন্ন হতে পারেনি। আর এই উপাদানগুলো ছাড়াও উপাদান হিসেবে সামাজিক-আত্মপরিচয়মুক্ত না হলে কোনো সমাজ উৎসব উদ্​যাপনে সক্ষমতা অর্জন করে না। অন্যদিকে উৎসবটি সম্পন্ন হয় ধর্মীয়ভাবে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সমাজের ধর্ম-সামাজিক সত্তার জাগরণীও আবশ্যক। পূর্ব বাংলা, অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে উপর্যুক্ত বিষয়গুলো ধীরে ধীরে সংগঠিত হয়েছে ১৯৩০-এর দশকের প্রজন্ম থেকে। ১৯৩৭ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাংলার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে, বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর হাতে থাকায় এবং দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের ঔদার্যে বেঙ্গল প্যাক্ট স্বাক্ষরিত হওয়ার ফলে এই রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যে নতুন শিক্ষিত মুসলমান মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের উদ্ভব ঘটে, তাদের হাতেই বাঙালি মুসলমানের ধর্ম-সামাজিক আনন্দ-উৎসব হিসেবে সাংস্কৃতিকভাবে তাৎপযপূর্ণ ঈদ উৎসবের সূচনা। নব্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর ঈদ উৎসবকে সর্বজনীনতা জ্ঞান করে কাজী নজরুল ইসলামের লেখা এবং আব্বাসউদ্দীনের কণ্ঠে রেকর্ড করা গান: ‘ও মন, রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ’। ১৯৪০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে বাংলার ঈদ উৎসব ধীরে ধীরে ধর্ম-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে বৃহৎ থেকে বিশাল আবর্তনে রূপান্তরিত হচ্ছে। তবে বাংলার আধুনিক ঈদ উৎসবের ‘সেকাল’ সত্তর-আশি বছরও এখন পর্যন্ত অতিক্রম করেনি।

বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্তের নতুন ধারার এই ঈদ উৎসবের উদাহরণ হিসেবে আমরা পারোনো ঢাকা জেলার কালীগঞ্জ থানার অধিবাসী পুলিশ কর্মকর্তা খন্দকার আবু তালেবের আত্মজীবনীমূলক রচনা থেকে একটা অংশ উদ্ধৃত করছি:

‘রমজানের ও ঈদের চাঁদ দেখার জন্য ছেলে-বুড়োদের মধ্যে তখনকার দিনে যে উৎসাহ–উদ্দীপনা দেখেছি, তা এখনো ভুলতে পারিনি। আমি যে সময়ের কথা বলছি সে সময়টা ছিল ব্রিটিশের [শেষ] আমল। রোজার চাঁদ ও ঈদের চাঁদের খবরাখবর তখন কলকাতা হতে প্রচার করা হতো।’ এখানে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষিত ও সম্পন্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদ উদ্​যাপন এবং তার প্রস্তুতিপর্বের চিত্রও পাওয়া যায়। তৎকালীন ঢাকা জেলার পূর্বাঞ্চলের উপর্যুক্ত লেখকের বর্ণনায় আবার চোখ ফেরানো যাক। তিনি লিখেছেন:

‘রোজার পনর দিন যাওয়ার পর হতেই গৃহবধূরা নানা রকম নকশী কাঁথা তৈয়ার করতে আরম্ভ করত।…শবে কদরের রাতে মেয়েরা মেহেদী এনে তা বেটে হাতে নানা রকম চিত্র আঁকত। ফুলপিঠা তৈয়ার করার সময় বউয়েরা “প্রিয় স্বামী” আর অবিবাহিত মেয়েরা, “বিবাহ ও প্রজাপতি” এঁকে রাখত। ঈদের দিনে যুবক-যুবতী বন্ধু-বান্ধবীদের পাত্র দেখার জন্যই এ ধরনের ফুলপিঠা তৈয়ার করা হত।’
পূর্ব বাংলার কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজে বিত্তহীনতা ও নগদ পয়সার অভাব থাকায় দরিদ্র কৃষি পরিবারে ঈদ উৎসবের কোনো ধুমধাম ছিল না। ঔপনিবেশিক ইংরেজ আমলের শেষ দিকেও গ্রামীণ মধ্যবিত্ত পরিবারের যাঁরা শহরে চাকরি করতেন বা ছোটখাটো ব্যবসা বা ওকালতি করতেন, তাঁদের বাড়িতে ঈদের দিনের খাদ্যতালিকায় পোলাও-কোরমা-জর্দার দেখা মিলত। তাঁদের সন্তানসন্ততিরাও ভালো কাপড়চোপড় পেত মা-বাবার কাছ থেকে। এসব পরিবারের বড়রাও ঈদে নতুন জামাকাপড় কিনতেন। কিন্তু বিপুলসংখ্যক দেহাতি মানুষ প্রায় ভুখানাঙ্গা অবস্থায়ই ঈদের দিনটি অতিক্রম করেছে। জাকাতের দান-খয়রাত, মসজিদের শিরনি বা সম্পন্ন গৃহস্থবাড়ি থেকে দেওয়া কিছু ভালো খাবারই ছিল তাদের ঈদের দিনের সম্বল।

সেকালের ঈদ সম্পর্কে রাজনীতিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আত্মকথায় লিখেছেন: ‘ঈদের জামায়াতেও লোকেরা কাছাধুতি পরিয়াই যাইত। নমাজের সময় কাছা খুলিতেই হইত। সে-কাজটাও নমাজে দাঁড়াইবার আগে তবু করিত না। প্রথম প্রথম নমাজের কাতারে বসিবার পর অন্যের অগোচরে চুপি চুপি কাছা খুলিয়া নমাজ শেষ করিয়া কাতার হইতে উঠিবার আগেই কাছা দিয়া ফেলিত।’ তিনি অন্যত্র লিখেছেন: ‘তরুণদের ত কথাই নাই, বয়স্করাও সকলে রোজা রাখিত না। তারাও দিনের বেলা পানি ও তামাক খাইত। শুধু ভাত খাওয়া হইতে বিরত থাকিত। পানি ও তামাক খাওয়াতে রোজা নষ্ট হইত না, এই বিশ্বাস তাদের ছিল।’

দুই

এ লেখার সূচনায় আমরা বলেছি ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে বাংলায় ঈদের ‘সেকাল’ শুধু প্রাচীন নয়, তাতে ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার একটা ব্যাপারও আছে। এই কথাটার একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন। একটু আগে আমরা আবুল মনসুর আহমদের লেখায় বাংলার মুসলমানের যে চিত্র দেখেছি, মধ্যযুগের সাহিত্যে তার উল্টো চিত্র পাচ্ছি। চতুর্দশ শতকের বাঙালি কবি মুকুন্দরাম তাঁর চণ্ডীমঙ্গল-এ মুসলমানদের প্রগাঢ় ধর্মপ্রীতি সম্পর্কে লিখেছেন: ‘প্রাণ গেলে রোজা নাহি ছাড়ে।’ এইমতো ধর্মপ্রবণ মুসলমানরা ছিলেন আসলে বিদেশাগত অলি-আউলিয়া-সুফি-দরবেশজাতীয় মানুষ। তাঁদের খানকা, চিল্লা ও দরগাহে সেকালে ঈদ উৎসব হতো জাঁকজমকের সঙ্গে। তবে তার মূল কাণ্ডে ধর্মান্তরিত বাঙালি মুসলমানের কোনো বিশিষ্ট ভূমিকা ছিল না। এ প্রসঙ্গে আমরা ঘোড়ার আগে গাড়ি জোড়ার প্রসঙ্গটির কথা আবারও বলতে পারি। বাংলায় মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠার (১২০৪) অনেক আগেই পূর্ববঙ্গে ইসলাম প্রচারের অনুসঙ্গে নামাজ, রোজা ও ঈদ উৎসবের সূত্রপাত ঘটে। তবে সেটা এ দেশের বাঙালিদের ধর্মীয় কৃত্য বা ঈদ উৎসব হিসেবে নয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে রক্ষিত আব্বাসীয় খলিফাদের আমলের রৌপ্যমুদ্রা থেকে জানা যায়, অষ্টম শতকের দিকেই পূর্ববঙ্গে বহিরাগত মুসলমানদের আগমন ঘটে। আর এই বহিরাগত সুফি-দরবেশ ও তুর্ক-আরব বণিকদের মাধ্যমেই এ দেশে রোজা, নামাজ ও ঈদের প্রবর্তন হয়েছে বলে মনে করা হয়।

রাজধানী শহর ঢাকার (১৬০৮) প্রতিষ্ঠার পর এখানে মোগল শাসক, ঢাকার নবাব, অভিজাত ধনিক-বণিক সম্প্রদায় এবং আদি ঢাকাবাসীর বর্ণাঢ্য ঈদ উৎসব উদ্​যাপনের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু গ্রামীণ বাংলাদেশে সেকালে ঈদ উৎসব তেমন একটা ছিল না বললেই চলে। কারণ, কৃষিনির্ভর গ্রামবাংলার মুসলমানরা ছিল দরিদ্র, তাদের হাতে নগদ অর্থ ছিল না। আধুনিক অর্থে সামাজিক চেতনা ও কমিউনিটির বোধেরও তখন জন্ম হয়নি। ফলে ধর্মীয় উৎসবকে একটা সামাজিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর অবস্থাও সৃষ্টি হয়নি। ১৯৩৭-৪০-এ শেরেবাংলা, নজরুল, আব্বাসউদ্দীনের রাজনীতি, সাহিত্য ও সংগীতে তার সূত্রপাত। আর ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর নগর উন্নয়ন, মধ্যবিত্তের বিপুল বিস্তার এবং নগদ অর্থবিত্তের সমাগমে ঈদ উৎসব এক প্রধান বর্ণাঢ্য ও জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সেকাল থেকে একালে উত্তীর্ণ ঈদ উৎসব এখন অনুজ্জ্বল থেকে ক্রমে ক্রমে অত্যুজ্জ্বল মহিমায় অভিষিক্ত।

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিয়ে করলেন নাবিলা

২৭ এপ্রিল ২০১৮

ফেইজবুকে আমরা

  • পুরনো সংখ্যা

    SatSunMonTueWedThuFri
    14151617181920
    21222324252627
    282930    
           
      12345
    27282930   
           
          1
           
          1
    9101112131415
    30      
         12
           
          1
    2345678
    30      
       1234
    262728293031 
           
         12
           
      12345
    2728293031  
           
    891011121314
    2930     
           
        123
           
        123
    25262728   
           
    28293031   
           
          1
    2345678
    9101112131415
    3031     
          1
    30      
      12345
    272829    
           
        123
           
    28